মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে হরমুজ প্রণালিতে চলমান ষাট দিনের অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতির মেয়াদে কোনো ধরনের ফি নেওয়া হবে না, ওয়াশিংটন থেকে রবিবার আল জাজিরা এবং দিনাজপুর টিভি নিশ্চিত করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদিত না হলে ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এই কৌশলগত নৌপথে ফি বা টোল আরোপ করতে পারে বলে তিনি কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন অবস্থানের কথা পরিষ্কারভাবে জানান। মার্কিন স্বার্থ রক্ষা ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে অন্য কোনো শক্তির টোল আদায়ের কোনো আইনগত সুযোগ নেই বলে তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ট্রাম্প তার বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানান যে অন্তর্বর্তীকালীন এই বিশেষ সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও যদি কোনো স্থায়ী দ্বিপক্ষীয় চুক্তি না হয় তবে ওয়াশিংটন পরবর্তী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন সামরিক বাহিনী যে অভিভাবকসুলভ ভূমিকা পালন করে আসছে তার প্রকৃত ব্যয় আদায়ের জন্য এই ফি আরোপের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হতে পারে। ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের এক সাম্প্রতিক ঘোষণার পরই মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এই তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। ইরান দাবি করেছিল যে মার্কিন পক্ষ চুক্তির শর্ত ও প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করেছে এবং লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের কারণে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে।
তেহরানের এই সামরিক হুমকি এবং দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম। মার্কিন সামরিক এই কমান্ডের মুখপাত্র commander
টিম হকিন্স জানান যে চুক্তির সব শর্ত নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে মার্কিন বাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চলে সার্বক্ষণিক সতর্ক এবং অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। তিনি আরও বলেন যে বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক আছে এবং সেখানে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। মার্কিন এই সামরিক কর্মকর্তা দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে হরমুজ প্রণালির মূল নিয়ন্ত্রণ এককভাবে ইরানের হাতে নেই এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী এই নৌপথ সবার জন্য উন্মুক্ত। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহন রুট দিয়ে বৈস্মিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়মিত পরিবাহিত হওয়ায় এই নৌপথের যেকোনো উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।যা কম স্পষ্ট তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি ভবিষ্যতে এককভাবে এই আন্তর্জাতিক নৌপথে টোল আদায় শুরু করে তবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে তার কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী মুক্ত নৌচলাচলের অধিকারে এই ধরনের জোরপূর্বক ফি আরোপ নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। তেহরানের সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে আমেরিকার এই অবস্থান তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদকে আরও শক্তিশালী করবে যা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো সহজে মেনে নেবে না। এই পরিস্থিতিতে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান কী হবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান এই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে বলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার এই পরোক্ষ বাকযুদ্ধ আগামী দিনগুলোতে একটি নতুন সামরিক সংঘাতের রূপ নেয় কিনা তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ এবং নৌসেনা মোতায়েনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে। দুই দেশের এই অনমনীয় মনোভাবের কারণে আন্তর্জাতিক শান্তি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলো মাঝপথেই থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে যার ফলে ওমান উপসাগরে সামরিক উত্তেজনা বিরাজ করছে।
