দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির নুরেমবার্গে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক যুদ্ধাপরাধ বিচারে অন্যতম প্রধান কৌঁসুলি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মার্কিন আইনজীবী বেন ফেরেনৎস। ১৯৪৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন মার্কিন সামরিক ট্রাইব্যুনালে কুখ্যাত নাৎসি ভ্রাম্যমাণ ঘাতক বাহিনী আইনসাৎৎসগ্রুপেনের বিরুদ্ধে এই বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। ওই সময় প্রায় এক মিলিয়ন নিরীহ মানুষকে গণহারে গুলি চালিয়ে হত্যার দায়ে বাইশ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল। সে সময় মাত্র সাতাশ বছর বয়সে প্রধান প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পালন করা ফেরেনৎসের পরিচালিত এই বিচারকে সংবাদমাধ্যমগুলো ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম হত্যা মামলা হিসেবে চিহ্নিত করে।
নাৎসি বাহিনীর অপরাধের প্রমাণ তাদের নিজস্ব নথি থেকেই উদ্ধার করা হয়।
হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে ১৯৪৩ সালে শিক্ষা সমাপ্ত করে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন ফেরেনৎস। যুদ্ধ চলাকালে তিনি নরম্যান্ডির উপকূলে অবতরণ করেন এবং পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধ তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে মিত্রবাহিনীর উদ্ধার করা বুখেনওয়াল্ড কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে প্রবেশ করেন। সেখানে প্রত্যক্ষ করা অনাহারক্লিষ্ট বন্দি ও মৃতদেহের দৃশ্যকে তিনি নরকের চেয়েও মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় বলে স্মরণ করেছিলেন। পরবর্তীতে পেন্টাগনের নির্দেশে জার্মানিতে যেসব চিকিৎসক, বিচারক এবং শিল্পপতিরা নাৎসি যুদ্ধাপরাধে সহায়তা করেছিলেন, তাদের অপরাধের নমুনা সংগ্রহের জন্য বার্লিনে প্রায় পঞ্চাশ জন গবেষকের একটি দলের নেতৃত্ব দেন তিনি।
সেখানে আইনসাৎৎসগ্রুপেনের প্রতিদিনের হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত গোপন প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
পূর্ব ইউরোপ ও সোভিয়েত অঞ্চলে নাৎসি বাহিনীর এই বিশেষ ঘাতক স্কোয়াডে প্রায় তিন হাজার সদস্য যুক্ত ছিল বলে নথিতে নিশ্চিত হওয়া যায়। মূল ট্রাইব্যুনালের বাইরে এই ঘাতকদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো বিচার শুরুর প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনা না থাকলেও ফেরেনৎস প্রধান কৌঁসুলি জেনারেল টেলফোর্ড টেলরকে রাজি করিয়ে এই বিচারের সূচনা করেন। কাঠগড়ায় মাত্র বাইশটি আসন থাকায় এবং আসামির উপস্থিতির শর্ত বিবেচনা করে বন্দি থাকা উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা ও ডক্টরেট ডিগ্রিধারীদের মধ্য থেকেই বাইশ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ফেরেনৎস আদালতে স্পষ্ট করেন যে তিনি সবার বিচার করতে না পারলেও নথিপত্র সমৃদ্ধ সর্বোচ্চ পদাধিকারীদের দায়বদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আদালতের শুনানিতে কোনো আসামিই অপরাধের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেনি। তাদের সবাই নিজেদের নির্দোষ দাবি করে দাবি করেছিল যে তারা কেবল ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের আদেশ পালন করেছে। ফেরেনৎস এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে তাদের পাঠানো গোপন প্রতিবেদনগুলো ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেন, যেখানে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা নিয়ে আসামিরা নিজেরা গর্ব প্রকাশ করেছিল। বিচার প্রক্রিয়ায় বিশ জন নাৎসি কর্মকর্তাকে সরাসরি যুদ্ধাপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং বাকি দুজনকে অবৈধ সংগঠনের সদস্য হিসেবে দণ্ড দেওয়া হয়।
আদালতে শুনানির সময় ফেরেনৎস স্পষ্ট করেছিলেন যে তাদের উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নেওয়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের মাধ্যমে সব মানুষের নিরাপদে বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। পরবর্তীতে তিনি ১৯৯৮ সালে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রতিষ্ঠার পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে যুদ্ধই মূলত শিক্ষিত ও আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক দেশপ্রেমিক মানুষকে চরম খুনিতে রূপান্তরিত করে। তাই যুদ্ধের বিকল্প হিসেবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাকেই সবচেয়ে জরুরি কাজ হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন এই প্রবীণ আইনবিদ।
