ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে মস্কোর অগ্রযাত্রার শক্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে এবং ফ্রন্টলাইন এখন স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে বলে দাবি করেছেন ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক প্রধান ওলেকসান্দর সিরস্কি। সম্প্রতি দায়িত্ব থেকে অপসারিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া প্রথম বিশেষ বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। সাবেক এই জেনারেলের দাবি, রণক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক সেনার প্রাণহানির কারণেই রাশিয়ার সামনে এগিয়ে যাওয়ার গতি কার্যত রুদ্ধ হয়ে গেছে।
মস্কোর ক্ষয়ক্ষতি ইউক্রেনের চেয়ে বহুগুণ বেশি বলে দাবি করেছেন তিনি।
সিরস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো যুদ্ধে সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে রাশিয়ার ক্ষতির পরিমাণ ইউক্রেনের চেয়ে ছয় গুণ বেশি। তবে শুধুমাত্র নিহতের সংখ্যা হিসাব করলে তা ইউক্রেনের তুলনায় প্রায় এগারো গুণ পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। যদিও যুদ্ধরত দুই দেশের কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের নিহতের সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না। যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে সর্বাত্মক অভিযান শুরুর পর থেকে মস্কোর প্রায় পাঁচ লাখ সেনা নিহত হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ সেন্টারের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ইউক্রেন হারিয়েছে প্রায় দেড় লাখ সেনা।
যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান অচলাবস্থার পেছনে ভূখণ্ড দখলের গতি কমে আসাকে প্রধান লক্ষণ হিসেবে তুলে ধরেন সাবেক সেনাপ্রধান। তার দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে রাশিয়ার বাহিনী সামগ্রিকভাবে মাত্র ৬১ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করতে সক্ষম হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের প্রতিবেদনেও একই ধরনের প্রবণতা উঠে এসেছে। সংস্থাটির সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মস্কো যতটুকু এলাকা দখল করেছিল, তার চেয়ে বেশি ভূখণ্ড তারা হারিয়েছে।
কুরস্ক অভিযানকে কৌশলগত প্রয়োজন ছিল বলে দাবি করেন সিরস্কি।
২০২৪ সালে ইউক্রেনীয় বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন সিরস্কি। এর আগে ২০২২ সালে রাজধানী কিয়েভ রক্ষা ও খারকিভের সফল অভিযানের জন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভের সঙ্গে কৌশলগত মতবিরোধ এবং পরবর্তীকালে জনবিক্ষোভের মুখে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন। সিরস্কির জায়গায় নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান ৪৩ বছর বয়সী মেজর জেনারেল মিখাইলো দ্রাপাতি।
সাবেক এই জেনারেল জানান, অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহের ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর বাস্তব চাহিদাকে বিবেচনায় না নেওয়ার কারণেই সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে তার মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। ড্রোন সংগ্রহকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে ফ্রন্টলাইনের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় স্থলযান, পিকআপ ভ্যান ও মোটরসাইকেলের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি করা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। এমনকি ড্রোনের ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনীর চাহিদার মাত্র অর্ধেক পূরণ করা সম্ভব হয়েছিল। তবে তার নেতৃত্বেই ইউক্রেন প্রথম স্বতন্ত্র মানববিহীন ড্রোন শাখা গড়ে তোলে এবং বর্তমানে শত্রুপক্ষের আশি শতাংশ ক্ষয়ক্ষতি ড্রোন হামলার মাধ্যমেই হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পূর্বাঞ্চলের আভদিভকা ও ভুহলেদার থেকে সেনাদের দেরিতে প্রত্যাহারের অভিযোগ প্রসঙ্গে সিরস্কি জানান, ইউক্রেনকে অসম সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে। ২০২৫ সালে যুদ্ধবিমান ও বোমার ক্ষেত্রে রাশিয়ার পাল্লা ১৮ গুণ বেশি ভারী ছিল এবং তাদের কামানের সক্ষমতা ছিল ইউক্রেনের তুলনায় আড়াই গুণ। একইসঙ্গে মস্কোর হাতে প্রায় ৪০ লাখ সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনা সমাবেশের সুযোগ রয়েছে। আধুনিক যুদ্ধ দিন দিন স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে যাচ্ছে উল্লেখ করে সিরস্কি ইউরোপীয় দেশগুলোকে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য এখন থেকেই সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানান।
