হরমুজ প্রণালীতে ইরানের পক্ষ থেকে একের পর এক উস্কানিমূলক হামলা এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর রয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। সোমবার এক উচ্চপর্যায়ের সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের জেনারেল ড্যান কেইন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। রয়টার্স ও বিবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেন্টাগন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে ইরানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডগুলো এখনো বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু করার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে `প্রজেক্ট ফ্রিডম` নামের একটি বিশেষ অভিযান শুরু করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে জেনারেল ড্যান কেইন একটি মানচিত্র প্রদর্শন করে জানান যে, গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে ইরান অন্তত ১০ বার মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়েছে। এছাড়া ৯ বার বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালানো এবং দুটি কন্টেইনার জাহাজ জব্দের ঘটনাও ঘটেছে। জেনারেল কেইন বলেন, ইরানের এই হামলাগুলো মূলত নিম্ন পর্যায়ের এবং এর মাধ্যমে তারা বিশ্ব সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। তবে এই হামলাগুলো এখনো এমন কোনো পর্যায়ে পৌঁছায়নি যাকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের চূড়ান্ত সীমা বা থ্রেশহোল্ড বলা যায়। তিনি যোগ করেন যে, বর্তমানে পারস্য উপসাগরে প্রায় ১,৫৫০টি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়ে আছে যেখানে ২২,৫০০ জন নাবিক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের কাছে নতি স্বীকার করছে কি না। এর জবাবে তিনি কঠোর ভাষায় জানান যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো কিছুর কাছেই নতি স্বীকার করেননি। বরং এই মুহূর্তে পুরো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে। হেগসেথ বলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং তারা কোনো দেশ গঠন বা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়াতে চায় না। তাদের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা এবং বাণিজ্য সচল রাখা। তিনি উল্লেখ করেন যে ইরানের কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থা বর্তমানে ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে এবং তারা সামনের সারিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
পেন্টাগনের এই ব্রিফিংয়ে ব্যবহৃত ভাষা ছিল অত্যন্ত সতর্ক। বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই সতর্কতা মূলত ঘরোয়া রাজনীতির কথা মাথায় রেখে নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী জনমত বর্তমানে বেশ জোরালো এবং রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ হাজার মাইল দূরে কোনো অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধে জড়ানোর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এছাড়া বীমা কোম্পানি এবং শিপিং সংস্থাগুলো এখনো ট্রাম্পের `প্রজেক্ট ফ্রিডম` বা এসকর্ট ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না। এই আস্থার সংকট দূর করতেই পেন্টাগন বারবার আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে যে তারা সামরিক শক্তির প্রদর্শন বজায় রাখলেও এখনই সরাসরি সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয়।
জেনারেল কেইন সতর্ক করে দিয়েছেন যে মার্কিন ডেস্ট্রয়ারগুলো ইতিমধ্যে ইরানের ড্রোন ও দ্রুতগামী বোট শনাক্ত এবং প্রতিহত করছে। তিনি বলেন যে এই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজগুলো মার্কিন যুদ্ধশক্তির উপস্থিতি দেখতে এবং অনুভব করতে পারবে। একই সঙ্গে তিনি পরিষ্কার করেছেন যে যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর থাকা মানে এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের সংকল্পে কোনো ঘাটতি রয়েছে। যদি প্রয়োজন হয় তবে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় বড় ধরনের সামরিক অভিযানে নামতে পুরোপুরি প্রস্তুত। বর্তমান পরিস্থিতিকে তারা ইরানের পক্ষ থেকে আসা একটি বিরক্তিকর উপদ্রব হিসেবে দেখছেন যা এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। তবে আলোচনার মাধ্যমে বা সামরিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রেখে কীভাবে এই অচলাবস্থা নিরসন হয় তা-ই এখন দেখার বিষয়।
