যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট এক নজিরবিহীন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিবিসি নিউজ ও স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ব্রিটিশ সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং তার পদ থেকে আকস্মিক পদত্যাগ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও লেবার পার্টির প্রধান কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা হারানোর কথা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে সাম্প্রতিক নির্বাচনে লেবার পার্টির নজিরবিহীন ভরাডুবি এবং বিপর্যয়ের পর সরকারের ভেতর যে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে তা প্রকাশ্যে চলে এলো।
প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের কাছে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্রে স্ট্রিটিং তার গভীর ক্ষোভ ও হতাশার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দুর্বল নেতৃত্বের ওপর তার আর কোনো ভরসা নেই এবং এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা তার জন্য নীতিগতভাবে অথবা সম্মানজনকভাবে সম্ভব নয়। পরবর্তীতে এই কঠোর চিঠিটি তিনি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এর ভেরিফায়েড হ্যান্ডেল থেকে প্রকাশ করেন, যা মুহূর্তের মধ্যে ব্রিটিশ রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি করে। স্ট্রিটিং দাবি করেছেন যে কিয়ার স্টারমার আগামী সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টিকে সফলভাবে নেতৃত্ব দিতে সম্পূর্ণ অক্ষম।
পদত্যাগপত্রে প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের তীব্র সমালোচনা করে বিদায়ী এই স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেছেন যে যেখানে দেশের মানুষের জন্য সরকারের একটি সুস্পষ্ট এবং সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি দরকার, সেখানে বর্তমানে কেবল একটি বিশাল শূন্যতা বিরাজ করছে। সরকারের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাবে পুরো দেশ ও প্রশাসন এখন যেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ভেসে চলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্ট্রিটিংয়ের এই খোলাখুলি বিদ্রোহ দলের ভেতরে স্টারমার-বিরোধী শক্তিকে আরও শক্তিশালী করবে। লেবার পার্টির ভেতরে বেশ কিছুদিন ধরেই শীর্ষ নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুপ্ত আলোচনা চলছিল, যা এখন এক উন্মুক্ত লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে দলের চরম বিপর্যয়কর ফলাফলের পর থেকেই মূলত কিয়ার স্টারমারের বিরুদ্ধে লেবার পার্টির ভেতরে ও বাইরে তীব্র চাপ বাড়তে শুরু করে। ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, লেবার পার্টির কয়েক ডজন সংসদ সদস্য বা এমপি ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। লেবার পার্টির নিজস্ব নিয়মনীতি অনুযায়ী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হলে যেকোনো প্রার্থীর অন্তত ৮১ জন এমপির লিখিত সমর্থন প্রয়োজন হবে। স্ট্রিটিং সেই প্রয়োজনীয় সমর্থন পাওয়ার জন্য দলের ভেতর জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টি সরকারের ভেতরের অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল গত সপ্তাহ থেকেই চরম আকার ধারণ করেছে। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর ক্ষোভে ও হতাশায় সরকারের চারজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পদ থেকে একযোগে পদত্যাগ করেছিলেন। সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী স্টারমার এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্ট্রিটিংয়ের মধ্যে ডাউনিং স্ট্রিটে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু উত্তপ্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের পরদিনই স্ট্রিটিংয়ের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। স্ট্রিটিং অভিযোগ করেছেন যে বর্তমান নেতৃত্ব জনগণের বিপুল প্রত্যাশা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো ভিশন নেই।
