শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

লিভারপুল ছাড়ার ঘোষণা ও মোহাম্মদ সালাহর সাফল্যের গোপন রহস্য

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ২৩, ২০২৬, ০৩:২৩ পিএম

লিভারপুল ছাড়ার ঘোষণা ও মোহাম্মদ সালাহর সাফল্যের গোপন রহস্য

চলতি মৌসুমের শেষে ইংলিশ ক্লাব লিভারপুল ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন মিসরীয় ফরোয়ার্ড মোহাম্মদ সালাহ। তাঁর এই বিদায়ের সিদ্ধান্তে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে এক শূন্যতার সৃষ্টি হলেও সাবেক রেডস বস ইয়ুর্গেন ক্লপ তাঁকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। 

অ্যানফিল্ডে কাটানো প্রথম পাঁচ মৌসুমেই সালাহ ১৫৬টি গোল করে ক্লাবটিকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রিমিয়ার লিগ, সুপার কাপ এবং ক্লাব বিশ্বকাপ সহ একাধিক মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি জিতিয়েছেন। তবে সালাহর এই অনন্য সাধারণ সাফল্য কেবল মাঠের পারফরম্যান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি তাঁকে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের আদর্শ আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।তাঁর সাফল্যের এই দীর্ঘ পথচলা চরম ত্যাগ, অদম্য ইচ্ছা এবং অবিচল নিষ্ঠার এক অনন্য দলিল।

মিসরের নাগরিগ নামের একটি প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত গ্রামে বেড়ে ওঠা সালাহর ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নটি সহজ ছিল না। মাত্র ১৪ বছর বয়সে যখন তিনি আল মকাওলুন আল আরব ক্লাবে যোগ দেন, তখন প্রশিক্ষণের জন্য প্রতিদিন তাঁকে দীর্ঘ নয় ঘণ্টা বাসে যাতায়াত করতে হতো। শুরুর দিকে বছরের পর বছর এমন হাড়ভাঙা খাটুনি আর বাসের ক্লান্তিকর ভ্রমণ তাঁর মনস্তাত্ত্বিক শক্তিকে গড়ে তুলেছিল। 

ক্যারিয়ারের এক পর্যায়ে টানা দুই মাস সাইড বেঞ্চে বসে থাকার পর হতাশ সালাহ যখন খেলা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিলেন, তখন তাঁর বাবার একটি উপদেশ তাঁর পুরো জীবন বদলে দেয়। সালাহর বাবা তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে বড় তারকা হতে হলে শুরুতে চরম কষ্ট সহ্য করতেই হয় এবং সালাহ যদি কঠোর পরিশ্রম বজায় রাখেন তবে তিনি অবশ্যই মাঠে ফিরবেন।

বাবার সেই মূল্যবান কথা বুকে আগলে রেখে সালাহ পুনরায় মাঠে নামেন এবং এর পরেই তাঁর ইউরোপ যাত্রার দরজা খুলে যায়। সুইজারল্যান্ডের ক্লাব এফসি বাসেলের হয়ে চুক্তি করার দিনই তিনি নিজেকে একজন ভিন্ন স্তরের খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। কিন্তু ইউরোপের মাটিতে রাতারাতি সাফল্য ধরা দেয়নি, বিশেষ করে চেলসিতে যোগ দেওয়ার পর পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ না পেয়ে তাঁর ক্যারিয়ার বড় ধাক্কা খায়। 

নিজের ফুটবল দক্ষতাকে পুনর্গঠন করতে তিনি ইতালির সিরি-আ লিগের ক্লাব ফিওরেন্তিনা ও পরবর্তীতে রোমায় যোগ দেন এবং সেখানে দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়ে বিশ্ব মিডিয়ার নজর কাড়েন। ২০১৭ সালে পুনরায় ইংল্যান্ডের ক্লাব লিভারপুলে ফিরে আসার সময় তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে প্রিমিয়ার লিগে খেলার আনন্দ এবং ক্লাবের জন্য ট্রফি জেতাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।

সালাহ নিজের মানসিক ও শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানান যে তিনি প্রতি মুহূর্তেই নিজেকে চাপের মুখে রেখে উন্নত করার চেষ্টা করেন। তিনি নিজের পুরো জীবন ফুটবলের পেছনে উৎসর্গ করেছেন এবং তাঁর মাথায় সবসময় কেবল এই খেলাটিই ঘোরে। তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি কঠোর দৈনিক রুটিন, যার মধ্যে রয়েছে নিয়মিত বরফ স্নান বা আইস বাথ নেওয়া, বিশেষ ডায়েট হিসেবে অ্যালমন্ড মিল্ক বা কাঠবাদামের দুধ পান এবং গভীর ধ্যান বা মেডিটেশন করা। 

তাঁর ঘরটিকে একটি ছোটখাটো হাসপাতালের মতো আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে সাজানো হয়েছে, যেখানে ইনজুরি প্রতিরোধ ও দ্রুত রিকভারির জন্য ক্রায়োথেরাপির ব্যবস্থা রয়েছে। এই জীবনযাত্রাই তাঁকে ৩৪ বছর বয়সেও তরুণদের মতো ক্ষিপ্র ও চটপটে রেখেছে।

আরব বিশ্ব, আফ্রিকা এবং বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে সালাহ কেবল একজন ক্রীড়াবিদ নন, বরং একজন অনুপ্রেরণার উৎস। মাঠে গোল করার পর তাঁর চেনা ভঙ্গিতে সেজদা দেওয়া বা ইসলামি মূল্যবোধ বজায় রাখা পশ্চিমা বিশ্বে মুসলিমদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। 

তিনি প্রমাণ করেছেন যে সঠিক লক্ষ্য এবং সুশৃঙ্খল জীবন বজায় রাখলে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করে বিশ্বমঞ্চের শীর্ষে পৌঁছানো সম্ভব। লিভারপুল থেকে তাঁর প্রস্থান ফুটবল ইতিহাসের একটি সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটালেও সালাহর তৈরি করা উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

banner
Link copied!