ফুটবল মানেই নন্দনতত্ত্ব, সাম্বার ছন্দ আর আবেগি লড়াইয়ের এক মহাকাব্য। তবে বিশ্বকাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে প্রতিটি দল যখন জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, তখন কখনো কখনো আবেগ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। ফুটবলের সর্বোচ্চ এই আসরে মাঠে উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে ওঠে, তখন রেফারির পকেটে থাকা লাল কার্ড বা বহিষ্কারাদেশ হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, সফলতম দলগুলোর পাশাপাশি এই লাল কার্ড পাওয়ার তালিকার শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল শক্তিধর দেশগুলো।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি লাল কার্ড দেখার অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের মালিক ব্রাজিল। বিভিন্ন ক্রীড়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই পর্যন্ত বিশ্বকাপে ১১টি লাল কার্ড দেখেছে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা। ব্রাজিলের এই রেকর্ডের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৩৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে জোড়া লাল কার্ডসহ শুরু করে ১৯৯৪ কিংবা ২০১০ বিশ্বকাপের উত্তপ্ত ম্যাচগুলোতে ব্রাজিলীয় খেলোয়াড়দের মাঠ থেকে বহিষ্কার হওয়ার ঘটনা ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখনো দাগ কেটে আছে। সৃজনশীল ফুটবলের জন্য পরিচিত দলটির এই পরিসংখ্যান তাদের আগ্রাসী মানসিকতারই পরিচয় বহন করে।
তালিকায় ব্রাজিলের ঠিক পরেই অবস্থান করছে তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা। ফুটবল বিশ্বের অন্যতম এই পরাশক্তি বিশ্বকাপে মোট ১০টি লাল কার্ড দেখেছে। ১৯৯০ সালের ফাইনালে আর্জেন্টিনার দুই খেলোয়াড়ের বহিষ্কার হওয়ার মতো ঘটনা এখনো ক্রীড়া ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে অনেক সময় আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা রেফারির কঠোর সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছেন। এরপরই তালিকায় রয়েছে উরুগুয়ে ও ক্যামেরুন, যারা প্রত্যেকে ৯টি করে লাল কার্ড দেখেছে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের ডিসিপ্লিনারি ইতিহাসে কার্ড পাওয়ার প্রবণতা বিভিন্ন আসরে ভিন্ন রকম ছিল। ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে রেফারিদের কড়াকড়িতে এক আসরেই সর্বোচ্চ ২৮টি লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল, যা ফুটবলের ইতিহাসে একটি বিশেষ রেকর্ড। আবার ১৯৫০ বা ১৯৭০ সালের মতো আসরে লাল কার্ডের সংখ্যা ছিল নগণ্য। ফুটবলের বিবর্তনের সাথে সাথে মাঠের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ফিফা প্রতিনিয়ত নিয়মকানুন কঠোর করেছে। তবে মাঠের উত্তেজনার মুহূর্তে পেশাদার খেলোয়াড়দের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যে কতটা চ্যালেঞ্জিং, এই পরিসংখ্যানগুলো তারই প্রমাণ। ফুটবল কেবল গোলের খেলা নয়, বরং এটি শৃঙ্খলা ও ধৈর্যেরও পরীক্ষা। শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে টেকনিক্যাল স্কিলের পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বিশ্বকাপের এই লাল কার্ডের ইতিহাস বারবার মনে করিয়ে দেয়।
