যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল শহরের একটি বাণিজ্যিক কারখানায় কাজ করতেন তরুণ ট্রেভর ওয়ার্মেডাল। প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার দুধ প্রক্রিয়াজাত করে পনির তৈরি করলেও তিনি যে প্রাণীদের দুধ ব্যবহার করতেন, সেগুলোকে কখনো চোখেও দেখেননি। খাদ্য উৎপাদনের এই বিচ্ছিন্নতা তাকে ভাবিয়ে তোলে। শেষ পর্যন্ত স্থায়ী চাকরি ছেড়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন বিশ্বের সেইসব প্রত্যন্ত জনপদের সন্ধানে, যেখানে প্রাচীন নিয়মে এখনো তৈরি হয় দুর্লভ জাতের পনির।
তার এই ব্যক্তিগত অনুসন্ধান রূপ নিয়েছে দীর্ঘ এক বিশ্বভ্রমণে।
অভিযানের শুরুতে ২০১৯ সালে তিনি পৌঁছান মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটারে। সেখানে একটি ঐতিহ্যবাহী তাঁবুতে থেকে তিনি দেখতে পান মঙ্গোলীয় সংস্কৃতিতে দুগ্ধজাত পণ্য কতটা পবিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। পনির তৈরির আগে মহিলারা আকাশের দিকে দুধ ছিটিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। পরে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে সোভিয়েত আমলের একটি কয়লাচালিত ট্রেনে তিনি গোবি মরুভূমি পাড়ি দেন। ফেরার পথে এক যাযাবর পরিবারের সাথে পরিচয় হলে তিনি জাভখান তৃণভূমির দুর্গম তাঁবুতে অতিথি হিসেবে থাকার সুযোগ পান।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে চমরি গাইয়ের দুধ দোহা থেকে শুরু করে ঘোড়ায় চড়ে গবাদিপশু তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া ছিল তার দৈনন্দিন কাজ। সূর্যাস্তের সময় রাখালদের লোকগান শোনা এবং কড়াইয়ে দুধ জ্বাল দিয়ে মিষ্টি-টক স্বাদের শুকনা দই তৈরির প্রক্রিয়া তিনি প্রত্যক্ষ করেন। এই অভিজ্ঞতা তার ভেতরের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, আধুনিকায়নের চাপে হাজার বছরের পুরনো এই গ্রামীণ কারিগরি দক্ষতা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
গত ছয় বছরে তিনি অন্তত ২০টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। বলকান পর্বতমালার প্রায় ১৯৩ কিলোমিটার দুর্গম পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েছেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের খাদ্য সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণের জন্য। জর্জিয়ার সীমান্তবর্তী তোশেতি পার্বত্য অঞ্চলে তার অভিজ্ঞতা ছিল সবচেয়ে রোমাঞ্চকর। সেখানে রাখালরা ধ্বংসপ্রাপ্ত মধ্যযুগীয় পাথরের টাওয়ারের ধ্বংসাবশেষের কাছে তাঁবু তৈরি করে বাস করেন। তারা কাঠের বালতি ব্যবহার করে ভেড়ার দুধ দোয়ান এবং উল্টো করা ভেড়ার চামড়ায় সেই পনির সংরক্ষণ করেন, যা স্থানীয়ভাবে তুশুরি গুদা নামে পরিচিত। গ্রীষ্ম মৌসুম শেষে প্রায় ৩০০ ভেড়ার পালের সাথে তিনি দুর্গম গিরিখাত বেয়ে ১৩০ কিলোমিটার পথ হেঁটে সমতলে নামেন।
খাদ্য সংস্কৃতি অনেক সময় ভাষার সীমানা ভেঙে দুই ভিন্ন প্রান্তের মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে।
নরওয়েতে ভ্রমণের সময় ওয়ার্মেডাল দেখা পান এক অদ্ভুত পনিরের, যার ওপর ফলের পচনের মতো ছত্রাকের আবরণ থাকে। স্বাদে ঝাঁঝালো এই খাদ্য প্রথমে তার পছন্দ না হলেও তিনি উপলব্ধি করেন যে কোনো খাবারের ভালো লাগা মূলত সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত। খাদ্য সংস্কৃতির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি তুরস্কের পনিরের কথাও স্মরণ করেন। দেশটিতে ছাগলের লোমযুক্ত চামড়ার ভেতরে রেখে পরিপক্ক করা তুলুম নামের বিশেষ পনির তৈরি হয়। ছাগলের চামড়ার থলিতে রাখা এই পনিরের স্বাদ ও গঠন ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও সমৃদ্ধ।
তিনি মনে করেন, পনির কেবল একটি খাবার নয়, বরং এটি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল, মাটি এবং মানুষের জীবনাচরণের এক ভোজ্য প্রকাশ। বাণিজ্যিক ডেয়রি শিল্পের বিকাশের কারণে প্রাণিসম্পদের বৈচিত্র্য বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় যাযাবর খামারিদের প্রাকৃতিক পনির তৈরির পদ্ধতিকে তিনি সবচেয়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব খাদ্য ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করেন। ভ্রমণকারীদের উদ্দেশ্যে তার পরামর্শ, শুধু দর্শনার্থী না হয়ে স্থানীয় খামারি ও কারিগরদের সাথে যুক্ত হয়ে তাদের কাজের অংশীদার হওয়া উচিত।
