মঙ্গোলিয়ার উত্তর সীমান্তের গভীর টাইগা বনে বসবাসকারী বল্গাহরিণ পালনকারী তসাতান জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয় শত শত মাইলের দুর্গম পথ। দেশটির রাজধানী উলানবাটর থেকে দীর্ঘ সড়ক ও ঘোড়ার পিঠে কয়েক দিনের সফর শেষে রাশিয়ার সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় এই ক্ষুদ্র যাযাবর সম্প্রদায়ের দেখা মেলে। প্রায় ৮০টি দুখা পরিবারের সমন্বয়ে গঠিত এই সম্প্রদায়টি স্থানীয়ভাবে তসাতান নামে পরিচিত, যাদের প্রধান অবলম্বন পোষা বল্গাহরিণের বিশাল পাল।
বছরে ছয় থেকে চল্লিশ বার এই যাযাবর পরিবারগুলো পাহাড়ে নিজেদের ক্যাম্প স্থানান্তর করে।
পাহাড়ের তাজা শ্যাওলা ও বল্গাহরিণের উপযোগী আবহাওয়ার সন্ধানে তসাতানরা প্রতিনিয়ত নিজেদের আবাস বদলায়। সাধারণ যাযাবরদের মতো তারা মাটির ওপর স্থায়ী কাঠামোয় থাকে না, বরং কনিকেল আকৃতির কাঠের তৈরি বিশেষ তাঁবুতে বাস করে, যাকে স্থানীয় ভাষায় অর্ৎজ বলা হয়। তসাতান পরিবারের সাথে পর্যটকদের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন জায়া ওলদোভ নামের একজন নারী, যিনি জন্মসূত্রে মঙ্গোলিয়ান-আমেরিকান হলেও বৈবাহিক সূত্রে এই সম্প্রদায়ের সদস্য। তার প্রতিষ্ঠিত তসাতান কমিউনিটি অ্যান্ড ভিজিটরস সেন্টারের মাধ্যমে এখন বহিরাগত পর্যটকেরা সরাসরি স্থানীয় পরিবারের অতিথি হিসেবে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।
শীতকালে এখানকার তাপমাত্রা শূন্যের নিচে ৫৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়।
তসাতানদের ডেরায় পৌঁছানোর যাত্রাটি বেশ জটিল ও কয়েকটি ধাপে বিভক্ত। রাজধানী উলানবাটর থেকে পাকা সড়ক ধরে প্রথমে ৬৩০ কিলোমিটার বা ৩৯১ মাইল পাড়ি দিয়ে আঞ্চলিক প্রবেশদ্বার মরুন শহরে যেতে হয়। মরুন থেকে সীমান্তবর্তী সংরক্ষিত অঞ্চলে প্রবেশের সরকারি অনুমতিপত্র সংগ্রহ করার পর শুরু হয় সাগাননুর শহরের দিকে যাত্রা। সাগাননুর লেক সংলগ্ন কাঠের তৈরি হোমস্টে পর্যন্ত পৌঁছাতে কাটাতে হয় প্রায় ২২ ঘণ্টা, যা নদী পারাপার ও জলমগ্ন জলাভূমির বুক চিরে চলা সম্পূর্ণ মানচিত্রবিহীন কাঁচা পথ। সাগাননুর থেকেই শুরু হয় মূল পার্বত্য পর্ব, যেখানে ঘোড়ায় চড়ে জলাভূমি ও পাইন বন পেরিয়ে পৌঁছাতে আগস্ট মাসের মৌসুমে প্রায় চার ঘণ্টা সময় লাগে, তবে বছরের অন্যান্য সময়ে এই অংশ পাড়ি দিতে আট থেকে বারো ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যায়।
কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী অর্ৎজের ভেতর থাকে কেবল কয়েকটি সরু কাঠের বিছানা ও লোহার অগ্নিকুণ্ড। সেখানে বিদ্যুৎ কিংবা কোনো ধরণের সরবরাহকৃত পানির লাইন নেই। তসাতানরা দৈনন্দিন পুষ্টির জন্য বল্গাহরিণের দুধ থেকে তৈরি পনির, মাখন ও বিশেষ নোনতা চায়ের ওপর নির্ভর করে। তারা নিজেদের জীবিকার মাধ্যম এই হরিণ সহজে জবাই করে না, ফলে খাবারের জন্য ভেড়ার মাংসের ওপর নির্ভর করতে হয়। হিমায়িত ব্যবস্থা না থাকায় জবাই করা ভেড়ার কলিজা, কিডনি ও পাকস্থলী তাৎক্ষণিকভাবে সেদ্ধ করে গরম রুটির সাথে খাওয়া হয়।
বন থেকে টানা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও হরিণের দুধ দোহন করেই ভোর শুরু হয় পুরো ক্যাম্পের। সম্প্রতি বনাঞ্চলে শিকারের ওপর বিধিনিষেধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে এই প্রাচীন জনপদের মানুষেরা জীবিকার তাগিদে পর্যটনের দিকে ঝুঁকছেন। অতিথিরা অর্থের পাশাপাশি সহায়তা হিসেবে প্রয়োজনীয় ময়দা, লবণ, কালো চা এবং ব্যাটারি দিয়ে থাকেন। চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাবে তারা সাইবেরিয়ান পাইন কিংবা বিশেষ ভেষজ উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করেন এবং আধ্যাত্মিক সংকটে স্মরণ করেন গোত্রের ওঝা বা শামানকে, যিনি পুরোনো ঐতিহ্যের নিদর্শন ও বুনো পাখির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্বলিত পোশাক পরিধান করে প্রার্থনা পরিচালনা করেন।
তসাতানদের সাথে থাকার জন্য ন্যূনতম তিন দিন ও দুই রাতের প্যাকেজ বুক করতে হয়। সব খরচ মিলিয়ে দুই রাতের জন্য জনপ্রতি ব্যয় হয় প্রায় ২০০ ডলার বা ১৫১ পাউন্ড, যা সরাসরি ব্যয় হয় স্থানীয় সম্প্রদায়ের উন্নয়নে। আগ্রহী ভ্রমণকারীরা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে +৯৭৬ ৯৯৭৭ ০৪৮০ নম্বরে সরাসরি যোগাযোগ করে মরুন থেকে ফোর-বাই-ফোর গাড়ি ও ঘোড়ার সার্বিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেন।
