মানুষের ঘুম কখন আসবে এবং সেই ঘুম কতটা গভীর হবে তা নির্ধারণে আলোর মতোই কার্যকর ভূমিকা রাখে পরিবেশের তাপমাত্রা। আন্তর্জাতিক গবেষক দলগুলোর সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শরীরের সার্কাডিয়ান ছন্দ বা অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি পরিচালনায় তাপমাত্রার পরিবর্তন অত্যন্ত জোরালো সংকেত হিসেবে কাজ করে। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ধারণা ছিল যে কেবল সূর্যালোক ও অন্ধকারের ওপর ভিত্তি করেই মানুষের ঘুম নিয়ন্ত্রিত হয়।
তবে বিশ্বের প্রাচীন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর গবেষণায় এই প্রচলিত ধারণার বড় ব্যতিক্রম মিলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা বলিভিয়ার আমাজন অঞ্চলের সিমানে, উত্তর তানজানিয়ার হাদজা এবং আফ্রিকার স্যান জনগোষ্ঠীর ঘুম পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন তারা কৃত্রিম বিদ্যুৎহীন পরিবেশে বাস করা সত্ত্বেও সূর্যাস্তের কয়েক ঘণ্টা পর ঘুমাতে যান এবং সূর্যোদয়ের আগেই জেগে ওঠেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক জেরোম সিগেল ও নৃতত্ত্ববিদ গান্ধী ইয়েতিশের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়, তাদের এই চক্র আলোর ওপর নয় বরং সন্ধ্যার পর পরিবেশের তাপমাত্রা কমার ওপর নির্ভরশীল। আধুনিক শিল্পোন্নত সমাজে যেখানে অনিদ্রার হার ব্যাপক, সেখানে এসব আদিবাসীদের স্থানীয় ভাষায় অনিদ্রা বোঝাতে কোনো শব্দই নেই।
সাধারণ শারীরবৃত্তীয় নিয়মেই ঘুমের প্রস্তুতিকালে মানবদেহের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা দিনের তুলনায় রাতের বেলায় প্রায় এক ডিগ্রি সেলসিয়াস হ্রাস পায়। জার্মানির বার্লিনের স্লিপ মেডিসিন সেন্টারের গবেষক সেবাস্তিয়ান হারবার্গার ব্যাখ্যা করেন, শোবার ঘরের পরিবেশ অতিরিক্ত উষ্ণ হলে মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবে শীতল হতে পারে না, যার ফলে ঘুমের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। নিয়ন্ত্রিত এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, রাতে ঘরের তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ধাপে ধাপে ২৪ ডিগ্রিতে নামিয়ে ভোরবেলায় পুনরায় বাড়ানো হলে শরীরে মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায় এবং ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর অনেক বেশি সতেজ লাগে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক রাসেল ফস্টার জানান, শরীরের সার্কাডিয়ান ছন্দ কেবল দেহের ভেতরের তাপমাত্রাই কমায় না, পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রার ওঠানামাও উল্টো স্নায়ুতন্ত্রে নতুন জৈবিক সংকেত পাঠায়। গবেষণাগারে প্রাণী ও মানব কোষের ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, তাপমাত্রার পরিবর্তন দেহঘড়িকে নতুন করে সমন্বয় করতে সক্ষম। অতীতে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, শোবার ঘরের তাপমাত্রা ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস কমালে মানুষের ঘুম-জাগরণের সার্বিক চক্র প্রায় তেইশ মিনিট দীর্ঘায়িত হয়।
তবে সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান কাজোচেন উল্লেখ করেছেন, তাপমাত্রা মানুষের ঘুমের গতিপ্রকৃতি প্রভাবিত করতে পারলেও তা এখনো এককভাবে আলোর বিকল্প হয়ে ওঠেনি। শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে ঘুম মূলত তিনটি ব্যবস্থার জটিল সমন্বয়ে ঘটে—জাগ্রত থাকার সময়সীমা বৃদ্ধির সাথে স্লিপ হোমোস্ট্যাটের চাপ, সার্কাডিয়ান ঘড়ির পর্যায়ক্রম এবং যেকোনো জরুরি মুহূর্তে মস্তিষ্ককে সতর্ক করে তোলা স্নায়ুব্যবস্থা।
আধুনিক নগরজীবনে দিন ও রাতে একই নিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম তাপমাত্রার ঘরে আবদ্ধ থাকাকেই অনেক বিজ্ঞানী অনিদ্রা বৃদ্ধির অন্যতম অনুঘটক মনে করছেন। ফলে প্রকৃতি ও শরীরের স্বাভাবিক শীতল হওয়ার চক্র বজায় রাখা ভালো ঘুমের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
