শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

চীনের কয়লা খনিতে বিস্ফোরণ: শানজিতে নিহত অন্তত ৯০

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ২৩, ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম

চীনের কয়লা খনিতে বিস্ফোরণ: শানজিতে নিহত অন্তত ৯০

চীনের উত্তরের শানজি প্রদেশের লিউশেনইউ এলাকায় চীনের কয়লা খনিতে বিস্ফোরণ-এর এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে অন্তত ৯০ জন খনি শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সময় গত শুক্রবার (২২ মে) সন্ধ্যা ৭টা ২৯ মিনিটে এই আকস্মিক দুর্ঘটনাটি ঘটে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আজ নিশ্চিত করেছে। বিস্ফোরণ সংঘটিত হওয়ার সময় ওই খনিটির ভেতরে মোট ২৪৭ জন শ্রমিক তাদের নিয়মিত নৈশকালীন দায়িত্ব পালন করছিলেন, যাদের মধ্যে শতাধিক শ্রমিককে উদ্ধারকারীরা নিরাপদে বাইরে নিয়ে আসতে সক্ষম হন।চীনের কয়লা খনিতে বিস্ফোরণ ও ব্যাপক প্রাণহানির এই ঘটনাটি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় খনি বিপর্যয়।

এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর পরই চীনের জরুরি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ছেড়ে আসা ছয়টি বিশেষ উদ্ধারকারী দলের মোট ৩৪৫ জন পেশাদার উদ্ধারকর্মীকে দুর্ঘটনাস্থলে মোতায়েন করেছে। তবে খনির ভেতরে অতিরিক্ত পানি জমে যাওয়া এবং খনি কর্তৃপক্ষের দেওয়া মূল নকশার সঙ্গে বাস্তব ভূগর্ভস্থ পরিস্থিতির অমিল থাকায় উদ্ধার অভিযান চালাতে উদ্ধারকর্মীরা চরম বেগ পাচ্ছেন। 

চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা দেওয়ার পাশাপাশি আটকে পড়াদের উদ্ধারে কোনো খামতি না রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি একই সঙ্গে এই বিস্ফোরণের মূল কারণ উদঘাটন করতে এবং খনি পরিচালনায় গাফিলতি থাকা দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন।

বর্তমানে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ২৭ জন খনি শ্রমিক চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। চিকিৎসকদের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, খনির ভেতরে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ও গন্ধহীন কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস ফুসফুসে প্রবেশ করায় চিকিৎসাধীন অধিকাংশ শ্রমিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত খনি শ্রমিক ওয়াং ইয়ং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন যে দুর্ঘটনার সময় তিনি কোনো বড় শব্দ শোনেননি, তবে হঠাৎ চারদিক ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যেতে দেখেন। 

তিনি আরও জানান যে খনির ভেতর হঠাৎ সালফারের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং জীবন বাঁচাতে শ্রমিকরা যখন প্রবেশদ্বার লক্ষ্য করে দৌড়াচ্ছিলেন, তখন অনেকেই বিষাক্ত গ্যাসের কারণে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ইয়ং নিজেও প্রায় এক ঘণ্টা অবশ হয়ে সেখানে পড়ে থাকার পর জ্ঞান ফিরে পান এবং তার পাশে অচেতন অবস্থায় থাকা আরেকজন শ্রমিককে ডেকে তুলে একসঙ্গে খনি থেকে বের হতে সক্ষম হন।

এই মারাত্মক গাফিলতির অভিযোগে খনিটির ব্যবস্থাপনা কমিটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আটক করেছে। জানা গেছে, চীনের জাতীয় খনি নিরাপত্তা প্রশাসন গত ২০২৪ সালেই এই নির্দিষ্ট লিউশেনইউ খনিটিকে মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ খনি হিসেবে অফিশিয়ালি তালিকাভুক্ত করেছিল। 

এমনকি খনি পরিচালনাকারী মূল প্রতিষ্ঠান তোংঝৌ গ্রুপকে খনির অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় গত ২০২৫ সালে দুইবার বড় ধরনের প্রশাসনিক জরিমানা করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, চীনের সামগ্রিক কয়লা উৎপাদনের চার ভাগের এক ভাগের বেশি সরবরাহ আসে এই শানজি প্রদেশ থেকে, যার কারণে খনিগুলোতে অতিরিক্ত উৎপাদন চাপ তৈরি হয় বলে মনে করা হয়।

এই বিপর্যয়টি ২০০৯ সালের পর চীনের খনি শিল্পে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় এবং অন্ধকার দুর্ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এর আগে গত ২০২৩ সালে দেশটির উত্তর অঞ্চলের ইনার মঙ্গোলিয়া এলাকায় একটি উন্মুক্ত কয়লা খনি ধসে পড়ার ঘটনায় ৫৩ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়াও ২০০৯ সালে উত্তর-পূর্ব হেইলংজিয়াং প্রদেশের একটি খনিতে শক্তিশালী বিস্ফোরণে ১০০ জনেরও বেশি খনি শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছিলেন। বৈশ্বিক রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার শীর্ষ নেতা ভ্লাদিমির পুতিনের চীন সফরের ঠিক কয়েকদিন পরেই এই মর্মান্তিক চীনের কয়লা খনিতে বিস্ফোরণ-এর ঘটনাটি ঘটল।

banner
Link copied!