ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী এবং যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন `প্যালেস্টাইন অ্যাকশন`-এর সমর্থনে আয়োজিত এক শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করেছে ব্রিটিশ পুলিশ, আল জাজিরা এবং এপি নিউজ জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বাইরে `ডিফেন্ড আওয়ার জুরিজ` নামক একটি মানবাধিকার ও অধিকারকর্মী গোষ্ঠীর আহ্বানে এই গণসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের প্রতি সমর্থন জানানোর কারণে যুক্তরাজ্যের কঠোর সন্ত্রাসবাদ আইনের অধীনে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে যে দমনমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তার প্রতিবাদ জানাতেই বিক্ষোভকারীরা সেখানে জড়ো হয়েছিলেন।
যুক্তরাজ্যের মেট্রোপলিটান পুলিশ সার্ভিস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের প্রতি যেকোনো ধরনের সমর্থন প্রদর্শন করা বর্তমান সন্ত্রাসবাদ আইনের অধীনে একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ। পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে যে এই নিয়ম ভাঙার কারণেই তারা তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারি অভিযান শুরু করেছে। গত ২০২৫ সালের জুন মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের শাসনামলে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে `সন্ত্রাসী` সংগঠন হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করে যুক্তরাজ্য সরকার, যা পরবর্তীতে আপিল আদালত কর্তৃক বহাল রাখা হয়। এই আইনের অধীনে দোষী সাব্যস্ত হলে একজন সাধারণ নাগরিকের সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
পুলিশের এই কঠোর পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে ডিফেন্ড আওয়ার জুরিজ। তারা জানিয়েছে যে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানানো এবং মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা কোনোভাবেই সন্ত্রাসবাদ হতে পারে না। সংগঠনটি যুক্তরাজ্যের সন্ত্রাসবাদ আইনের অপপ্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থনের অপরাধে হুইলচেয়ারে বসা একজন বৃদ্ধাকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে, যার এখন ১৪ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। সমাবেশে উপস্থিত অনেকেই গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি আগ্রাসন ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের চরম সহিংসতার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি পতাকা উড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার বলে আসছে যে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ইসরায়েল সরকারের প্রত্যক্ষ মদদেই পরিচালিত হচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সমর্থনে হওয়া প্রথম বড় ধরনের বিক্ষোভ। লেবার পার্টির বর্তমান নেতা বার্নহ্যাম নির্বাচনের আগে স্বীকার করেছিলেন যে গাজা ইস্যুতে পূর্ববর্তী কিয়ার স্টারমার সরকারের নেওয়া নীতিগুলো সঠিক ছিল না এবং তিনি এর জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমাও চেয়েছিলেন। তবে মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, যতক্ষণ না সরকার বাস্তবে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিচ্ছে, ততক্ষণ এই ধরনের মৌখিক ক্ষমার কোনো বাস্তব অর্থ নেই।
মানবাধিকার কর্মীদের এই ক্ষোভের পেছনে আরো একটি বড় কারণ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপে যুক্তরাজ্যের প্রত্যক্ষ সহায়তা। প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম সম্প্রতি মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ইরানের ওপর সরাসরি হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাজ্যের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দিয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাতকে বেশ কয়েকজন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ সম্পূর্ণ বেআইনি বলে আখ্যায়িত করেছেন। সমালোচকরা বলছেন, সরকার একদিকে মানবাধিকারের কথা বলছে, অন্যদিকে গাজায় চলমান ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ইসরায়েলকে আড়াল করতে দেশের নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে হরণ করছে।
যুক্তরাজ্যের গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কি প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যামের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন যেন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের ওপর থেকে অবিলম্বে এই অন্যায্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিবাদকারী গোষ্ঠীগুলোর ওপর এমন ভয়াবহ দমন-পীড়ন চালানোর কোনো যুক্তিসঙ্গত অজুহাত থাকতে পারে না। গ্রিন পার্টির প্রথম ইহুদি নেতা হিসেবে পোলানস্কি অভিযোগ করেছেন যে, ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং ইসরায়েলি গণহত্যার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে ডানপন্থী গণমাধ্যমগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার ধর্মীয় পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো, ক্রমাগত বাড়তে থাকা এই অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে যুক্তরাজ্যের নতুন সরকার ফিলিস্তিনপন্থীদের ওপর তাদের কঠোর আইনি অবস্থান পরিবর্তন করবে কি না।
