লোহিত সাগরে ইয়েমেনের সম্পূর্ণ উপকূলরেখা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুতি বাহিনী বলে শুক্রবার আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা নিশ্চিত করেছেন, আল জাজিরা ও রয়টার্স জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার ঐতিহাসিক মোখা বন্দর শহর দখলের মাধ্যমে সৌদি আরব সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর ওপর বড় ধরনের আঘাত হানে গোষ্ঠীটি। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া বিস্তৃত সংঘাতের পর এটিই আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
উপকূলীয় এই অগ্রযাত্রার ফলে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার এখন হুতিদের সরাসরি অস্ত্রের আওতায় চলে এসেছে।
এই কৌশলগত বিজয় সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানি অবকাঠামোর ওপর মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে জটিলতা সৃষ্টির পর রিয়াদ তার পশ্চিমাঞ্চলীয় লোহিত সাগরীয় ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে তেল সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। দেশটির পূর্ব-পশ্চিম প্রধান পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় সত্তর লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি স্থানান্তর করে বাব আল-মান্দেব দিয়ে বিশ্ববাজারে পাঠানোর ওপর নির্ভরতা আগের চেয়ে একুশ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তবে হুতিরা পুরো উপকূলীয় অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় রিয়াদের সেই বিকল্প নৌপথটিও কার্যকরভাবে অবরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মোট পরিমাণের প্রায় বারো শতাংশ প্রতিদিন লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খালের সংযোগকারী এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, সেখানে দীর্ঘমেয়াদী প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম একশো নয় ডলার ছাড়িয়ে আরও অস্থিতিশীল আকার ধারণ করতে পারে। ইতোমধ্যেই সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলীয় পাইপলাইন ও তেল ডিপোগুলোতে দূরপাল্লার ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে অসমর্থিত উপগ্রহ চিত্রে ধোঁয়ার অস্তিত্ব লক্ষ্য করা গেছে, যদিও সরকারিভাবে কোনো পক্ষই এখনো তা নিশ্চিত করেনি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেন ফ্রন্টে হুতিদের এই দ্রুত অগ্রগতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান অচলাবস্থায় শক্তিমত্তার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, বাব আল-মান্দেবের ওপর এমন ভূ-কৌশলগত কর্তৃত্ব মূলত প্রধান সামুদ্রিক করিডোরগুলোতে সংশ্লিষ্ট অক্ষের প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ঘটনা বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
সরকারি বাহিনীর আনুমানিক তিন লাখ সেনা সদস্য থাকা সত্ত্বেও আড়াই লাখ সদস্যের হুতি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার কারণে উপকূলীয় অবস্থান রক্ষা করা সম্ভব হয়নি বলে সামরিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেছেন। আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং বিগত এক দশকের দীর্ঘ লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা হুতিদের সামরিক কাঠামোকে অনেক বেশি সুসংহত করেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে একটি সামুদ্রিক প্রণালী কার্যত অচল করে দেওয়ার জন্য সার্বিক নৌবাহিনীর প্রয়োজন হয় না, বরং কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রের ভীতিই বাণিজ্যিক জাহাজ ও আন্তর্জাতিক বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ওই রুট এড়িয়ে চলার জন্য যথেষ্ট।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদি সামরিক বাহিনী মোখাসহ বিভিন্ন হুতি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ধারাবাহিক বিমান হামলা অব্যাহত রাখলেও তা তাদের অগ্রযাত্রা থামাতে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরুরি সামরিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে রিয়াদের শীর্ষ পর্যায় থেকে সরাসরি মার্কিন বিমান সহায়তার অনুরোধ জানানো হলেও ওয়াশিংটন বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে সরাসরি বিমান হামলা চালাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
