উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কো সীমান্ত অতিক্রম করে স্পেনের ছিটমহল সিউটায় গত দশ দিনে প্রায় দুই হাজার অভিবাসী প্রবেশ করার পর সেখানে চরম প্রশাসনিক ও মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে বলে আল জাজিরা এবং রয়টার্স জানিয়েছে। ইউরোপে উন্নত জীবনের আশায় বিপজ্জনক এই পথ পাড়ি দিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের আকস্মিক প্রবেশের ফলে স্থানীয় প্রশাসন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।
সিউটার আঞ্চলিক সরকারের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, গত দেড় সপ্তাহের মধ্যে এক হাজার পাঁচশ থেকে দুই হাজার মানুষ অবৈধভাবে তাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। বৃহস্পতিবার এক দিনেই আরও কয়েকশ অভিবাসী সীমান্ত পার হয়ে সেখানে পৌঁছানোর পর সিউটার আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট জেসুস বিভাস এটিকে সম্পূর্ণ মানবিক ও সামাজিক জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং সীমান্ত নিরাপত্তা পুনরায় জোরদার করতে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার অর্থাৎ মাদ্রিদের কাছে অবিলম্বে সামরিক বাহিনী পাঠানোর জোর দাবি জানিয়েছেন।
তবে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সংকটকে জাতীয় জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করার দাবিটি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা জানিয়েছে যে বর্তমান আইনি কাঠামোর অধীনে অভিবাসন সংকট মোকাবেলায় সরাসরি জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার কোনো সুযোগ নেই। যদিও মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি সামাল দিতে সিউটায় অতিরিক্ত মানবিক ও লজিস্টিক সহায়তা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের এই মতবিরোধ সংকট উত্তরণের প্রক্রিয়াকে কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সংবাদমাধ্যম এপি জানিয়েছে, অভিবাসীদের বড় একটি অংশ মরক্কোর দিক থেকে সমুদ্রপথে ভাসমান বিভিন্ন সরঞ্জামের সাহায্যে সিউটার উপকূলে এসে পৌঁছায়। এদের মধ্যে অনেকেই স্পেনের মাটিতে পা রাখার পর আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠেন এবং স্পেনের পক্ষে স্লোগান দেন। স্পেনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইএফই তাদের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে যে, সমুদ্রপথের পাশাপাশি অনেকেই স্থলভাগের সীমানা প্রাচীর টপকে স্পেনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছেন। এর ফলে স্থানীয় সড়কগুলোতে বিপুল সংখ্যক নতুন অভিবাসীর ভিড় দেখা গেছে।
মানবাধিকার কর্মী জাকারিয়া জারোকি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই আকস্মিক অভিবাসী স্রোতের সাথে ২০২১ সালের মে মাসের ঘটনার তুলনা করেছেন। ওই সময় মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে মরক্কো এবং সাব-সাহারান অঞ্চলের প্রায় দশ হাজার তরুণ একইভাবে সিউটায় প্রবেশ করেছিল, যা স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে বড় ধরনের কূটনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছিল। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
জারোকি আরও জানিয়েছেন যে, এখনো মরক্কোর সীমান্ত শহর ফনিদেকে অসংখ্য মানুষ জড়ো হচ্ছেন এবং তারা যেকোনো মূল্যে সীমান্ত অতিক্রম করে স্পেনে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করছেন। উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের এই দুটি ছিটমহল সিউটা এবং মেলিলা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে আফ্রিকার একমাত্র সরাসরি স্থল সীমান্ত। এই কারণে যুগ যুগ ধরে হাজার হাজার আফ্রিকান নাগরিক ইউরোপে প্রবেশের একটি নিরাপদ প্রবেশদ্বার হিসেবে এই সীমান্তকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে আসছেন। যা কম স্পষ্ট তা হলো, মরক্কো সরকার তাদের দিকের সীমান্ত সুরক্ষায় হঠাৎ করেই কোনো শিথিলতা দেখাচ্ছে কি না, নাকি এটি নিছকই একটি স্বতঃস্ফূর্ত জনস্রোত যা সামাল দিতে সীমান্তরক্ষীরা প্রস্তুত ছিলেন না।
