মস্কোর একটি পেট্রল স্টেশনে দীর্ঘ সারিতে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছেন চালকরা, যা ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার কারণে তেল শোধনাগারগুলোতে সৃষ্ট সংকটের ফল বলে বিবিসি নিউজ জানিয়েছে। চলতি সপ্তাহে মস্কোসহ রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে পেট্রলের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং গাড়িগুলোর দীর্ঘ সারি জনজীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। রুশ কর্মকর্তারা এই পরিস্থিতির জন্য তেল শোধনাগারগুলোতে অঘোষিত জরুরি মেরামত কাজকে দায়ী করেছেন, যা মূলত ইউক্রেনীয় বাহিনীর দূরপাল্লার ড্রোন হামলার কারণে বারবার ব্যাহত হচ্ছে।
এই জ্বালানি সংকটের ফলে রাজধানী মস্কো ও এর আশপাশের এলাকায় চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। অনেক পেট্রল স্টেশনে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় বোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনা অনুযায়ী, এটি চলতি গরমকালের দ্বিতীয় বড় জ্বালানি সংকট এবং এবারের লাইগুলো আগের তুলনায় অনেক দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিদেশ থেকে পেট্রল আমদানি শুরু করতে বাধ্য হয়েছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ঘাটতি কমাতে সরকার সাময়িকভাবে নিম্নমানের জ্বালানি উৎপাদনের অনুমোদন দিয়েছে, যা এক দশক আগে পরিবেশগত ও কারিগরি কারণে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এই নিম্নমানের জ্বালানি নিয়মিত ব্যবহারে আধুনিক গাড়ির ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশের দীর্ঘস্থায়িত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শুধু জ্বালানি খাত নয়, ইউক্রেনীয় হামলার কারণে রাশিয়ার বৃহত্তম ই-কমার্স লজিস্টিকস ও বিতরণ কেন্দ্রগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সাধারণ ক্রেতা ও বিক্রেতাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেছেন যে এই ধরনের অবকাঠামোগত হামলার কারণে কোনো সংকট তৈরি হয়নি এবং দেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন যে সরকারি বার্তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে গভীর ব্যবধান রয়েছে।
দেশটির বিভিন্ন জনমত জরিপে উঠে এসেছে যে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। মস্কো যখন সরকারিভাবে পতাকা দিবস উদ্যাপনের অংশ হিসেবে কনসার্ট, মিষ্টি বিতরণ এবং শিশুদের জন্য সামরিক প্রদর্শনী ও অস্ত্র প্রদর্শনের আয়োজন করছে, তখন সাধারণ মানুষ পেট্রল পাম্পের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের দৈনন্দিন সংগ্রামের কথা ভাবছেন। রাষ্ট্রীয় প্রচারণায় দেশপ্রেম ও ঐক্যের কথা জোরালোভাবে প্রচার করা হলেও সাধারণ মানুষের মনে যুদ্ধের তীব্রতা ও অনিশ্চয়তা গভীরভাবে গেঁথে গেছে।
যুদ্ধের এই বৈরী পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া বেশ মিশ্র প্রকৃতির দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ মনে করেন যে এই ধরনের জাতীয় সংকট ও কঠিন পরিস্থিতি নাগরিকদের আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ করে তোলে, আবার অনেকেই মনে করেন যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য এবং জ্বালানি সংকট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তুলছে। বিশেষ করে রাতেরবেলা বিস্ফোরণের শব্দ এবং ড্রোন হামলার আতঙ্ক সাধারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে গভীরভাবেই নাড়া দিচ্ছে, যার ফলে অনেকেই মানসিক চাপ কাটিয়ে ওঠার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই বহুমুখী সংকট রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের মানসিক অবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে।
