যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সোমবার ইউক্রেনের পঞ্চত্রিংশ স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের অংশ হিসেবে কিয়েভ সফরকালে ইউক্রেনকে নিজস্ব দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্য গোপন প্রযুক্তিগত তথ্য হস্তান্তরের ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতকারক এমবিডিএ কোম্পানিকে স্টর্ম শ্যাডো বা স্ক্যাল্প ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্রিটিশ যন্ত্রাংশ সম্পর্কিত গোপন তথ্য ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের কাছে উন্মুক্ত করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডেই এই উন্নত সামরিক সরঞ্জামগুলোর স্থানীয় সমাবেশ লাইন গড়ে তোলার পথ সুগম হবে বলে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
কিয়েভের সেন্ট সোফিয়া ক্যাথেড্রালের বাইরে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কির সাথে এক যৌথ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানান যে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় লন্ডন সর্বাত্মক সহায়তা অব্যাহত রাখবে। দুই হাজার তেইশ সালে যুক্তরাজ্য প্রথম পশ্চিমা দেশ হিসেবে ইউক্রেনকে এই দীর্ঘপাল্লার আঘাত হানার অস্ত্র সরবরাহ করেছিল, যা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক সহায়তার অনিশ্চয়তার মধ্যে ইউরোপীয় মিত্রদের এই পদক্ষেপ ইউক্রেনীয় বাহিনীকে কৌশলগতভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলবে বলে সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে উন্নত করার ওপর জোর দিয়ে আসছে এবং এই প্রযুক্তি হস্তান্তর সেই প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করবে।
এদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এই কিয়েভ সফরের কঠোর সমালোচনা করেছে মস্কো। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে যুক্তরাজ্য এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই সংঘাতের আগুনে ঘি ঢালছে এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে। তবে রুশ এই প্রতিক্রিয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে আক্রমণকারী কে তা বিশ্বের সবার জানা এবং আন্তর্জাতিক সীমানা জবরদস্তির মাধ্যমে পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। কিয়েভে অবস্থানকালে তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের নিয়ে গঠিত কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং বা ইচ্ছুক জোটের প্রথম বৈঠকে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন এবং ইউক্রেনীয় সুরক্ষায় যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের এই পর্যায়ে এই প্রযুক্তিগত সহযোগিতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ আশা করছে যে নিজস্ব উদ্যোগে এই ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু হলে কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় দেশগুলোর এই আত্মরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা আঞ্চলিক রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। উভয় দেশের শীর্ষ পর্যায়ের এই কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ আগামী দিনে বৈশ্বিক নিরাপত্তার সমীকরণকে নতুন রূপ দিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এই উদ্যোগটি প্রজেক্ট ব্রেইকস্টপ নামক একটি বৃহত্তর ব্রিটিশ কর্মসূচির অংশ, যার লক্ষ্য হলো ইউক্রেনের জন্য কম খরচে উন্নত দীর্ঘপাল্লার আঘাত হানার অস্ত্র দ্রুত বিকাশ করা। ইউক্রেনীয় যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান বাস্তবতায় এই ধরনের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এর আগে কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের সদর দপ্তর এবং বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনায় এই ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হলে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর রিমোট স্ট্রাইক ক্ষমতা আরও সুদৃঢ় হবে। সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি এই দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র উৎপাদন যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
