শুক্রবার, ০৮ মে, ২০২৬, ২৪ বৈশাখ ১৪৩৩

তরুণ প্রজন্মের কাজের ধরনে বড় পরিবর্তন: নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৮, ২০২৬, ১২:২৭ এএম

তরুণ প্রজন্মের কাজের ধরনে বড় পরিবর্তন: নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাপী যুব কর্মসংস্থান নিয়ে ইতিবাচক ও উদ্বেগজনক উভয় ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক যুব কর্মসংস্থান প্রবণতা শীর্ষক এই রিপোর্টে জানানো হয়েছে যে বিশ্বজুড়ে তরুণদের বেকারত্বের হার গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। কোভিড-১৯ পরবর্তী দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়ার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে বেকারত্ব কমলেও কাজের ধরন এবং স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

আইএলও-র তথ্যমতে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যুব বেকারত্বের হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে যা গত এক দশকে দেখা যায়নি। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারের ফলে বিপুল সংখ্যক তরুণ ঘরে বসেই আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে ফ্রিল্যান্সিং ও ছোট উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা এই হার কমাতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। তবে একই সঙ্গে গিগ ইকোনমি বা অস্থায়ী কাজের সংখ্যা বাড়ায় তরুণদের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর উত্থান তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। অনেক প্রথাগত কাজ এআই-এর দখলে চলে গেলেও প্রযুক্তিগত দক্ষতা সম্পন্ন তরুণদের জন্য বিপুল নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যারা কোডিং, ডেটা অ্যানালাইসিস এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো বিষয়ে পারদর্শী তাদের চাহিদাও অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। তবে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ডিজিটাল বৈষম্যের কারণে অনেক মেধাবী তরুণ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন যা বিশ্বব্যাপী এক নতুন বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

নারীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৬ সালের এই প্রতিবেদনে দেখা যায় কর্মক্ষেত্রে তরুণীদের অংশগ্রহণের হার গত দুই বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে এখনো পুরুষদের তুলনায় নারীরা গড়ে ২০ শতাংশ কম মজুরি পাচ্ছেন যা একটি বড় কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। আইএলও মহাপরিচালক তার বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে কেবল সংখ্যাগত কর্মসংস্থানই যথেষ্ট নয় বরং তরুণদের জন্য সম্মানজনক ও সুরক্ষিত কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা দেশগুলোর সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ ও ভারতের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এই প্রতিবেদনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এই অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী থাকলেও তাদের দক্ষতা এবং বাজার চাহিদার মধ্যে বড় গ্যাপ রয়ে গেছে। কারিগরি শিক্ষার অভাব এবং কেবল সনদভিত্তিক পড়াশোনার ফলে অনেক শিক্ষিত তরুণ এখনো যোগ্য কাজ পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। আইএলও পরামর্শ দিয়েছে যে সরকারগুলোকে এখন থেকে শুধু সাধারণ শিক্ষার পরিবর্তে হাতে-কলমে শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা তৈরির প্রকল্পে বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।

ভবিষ্যৎ সময়রেখা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতে আরও ৩০ কোটি নতুন তরুণ যুক্ত হবে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি না করতে পারলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আইএলও-র ২০২৬ সালের এই প্রতিবেদনটি মূলত বিশ্বনেতাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা যেখানে কাজের পরিমাণ নয় বরং কাজের গুণগত মান বা কোয়ালিটি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম এখন কেবল জীবিকা নয় বরং কাজের স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার প্রতিফলন চায় যা আধুনিক শ্রম বাজারের নতুন ট্রেন্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

banner
Link copied!