সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

লেবাননের কৃষি খাত

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের বিশ শতাংশের বেশি কৃষিভূমি ক্ষতিগ্রস্ত: কৃষিমন্ত্রীর তথ্য

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : নভেম্বর ২, ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের বিশ শতাংশের বেশি কৃষিভূমি ক্ষতিগ্রস্ত: কৃষিমন্ত্রীর তথ্য

ইসরায়েলি আগ্রাসনে লেবাননের প্রায় এক চতুর্থাংশ কৃষি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির কৃষিমন্ত্রী। এর মধ্যে দক্ষিণ ও নাবাতিয়ে গভর্নরেটেই ৫২ হাজার হেক্টর জমি রয়েছে এবং পূর্বের বালবেক-হারমেল গভর্নরেটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও ৪ হাজার হেক্টর জমি।

ফসলের পাশাপাশি গবাদিপশু, ভেড়া, ছাগল এবং মৌমাছি পালনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লেবাননে ৩০ হাজারের বেশি মৌচাক ধ্বংস হয়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৭০ শতাংশ গবাদিপশু মারা গেছে। তামাক ও জলপাই চাষের বিশাল এলাকাও এই ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চল লেবাননের প্রধান উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত, যেখান থেকে দেশের কলার ৯০ শতাংশ এবং সাইট্রাস ফলের ৭০ শতাংশ আসে।

২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমান্তবর্তী সংঘর্ষ শুরু হয় এবং ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তা পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযানে রূপ নেয়। ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকে। ইরানবিরোধী মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গত ২ মার্চ থেকে সংঘর্ষ আরও ছড়িয়ে পড়ে এবং একটি নতুন বড় সংঘাতে রূপ নেয়। অক্টোবরের মাঝামাঝি নাগাদ এই সংঘাতে ৪ হাজার ৩৮৯ জন নিহত এবং ১২ হাজার ৪২৫ জন আহত হন।

মন্ত্রী জানান যে ইসরায়েল এই সংঘাতে হোয়াইট ফসফরাস ব্যবহার করেছে এবং সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলে গ্লাইফোসেট হার্বিসাইড স্প্রে করেছে। লেবাননের কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত মাটি, পানি ও ফসলের পরীক্ষা চালায় এবং ফলাফল নিয়ন্ত্রিত মাত্রার মধ্যেই পায়। শীতের বৃষ্টি রাসায়নিকের প্রভাব কিছুটা কমাতে সাহায্য করে। তবে মার্চের পর থেকে চলমান লড়াই এবং বেশ কিছু এলাকায় ইসরায়েলি দখলদারিত্বের কারণে বিশেষজ্ঞ দলগুলো নতুন পরীক্ষার জন্য সব জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি।

দক্ষিণ লেবাননে জলপাই চাষের প্রায় ২৪ হাজার হেক্টর জমি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী কৃষিজমিতে বুলডোজার চালায়, গাছপালা উপড়ে ফেলে এবং জলপাই বাগান ধ্বংস করে, যার ফলে সাড়ে সাত শ হেক্টর জমি পুরোপুরি উৎপাদনের বাইরে চলে যায়। কৃষি মন্ত্রণালয় দখলকৃত এলাকার কাছের মিলগুলো থেকে ২০টি নমুনা সংগ্রহ করে জলপাই মাড়াই মৌসুম শুরু করে। পরীক্ষাকৃত এসব এলাকার জলপাই বা জলপাই তেল খাওয়া মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয় বলে ফলাফলে দেখা গেছে।

মার্চ মাসে নতুন করে লড়াই শুরু হলে স্থানীয় উৎপাদন মৌসুমের সাথে মিলে যাওয়ায় খাদ্যবাজারগুলো প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়ে। আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় লেবানন তখন মিশর, সিরিয়া ও জর্ডান থেকে আমদানির ওপর নির্ভর করে। তবে গ্রীষ্মকালীন ফল ও সবজির মৌসুমে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ায় এপ্রিলের দিকে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। এর আগে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছিল যে এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে লেবাননে প্রায় ১২ লাখ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে।

কৃষি খাত লেবাননের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৯ শতাংশ এবং সংশ্লিষ্ট খাদ্য শিল্পসহ তা ১৩ শতাংশে দাঁড়ায়। বাণিজ্য এবং সীমান্তজুড়ে রোগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সিরিয়া এখনো একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। লেবানন সিরিয়ায় অ্যাভোকাডো, আঙুর ও কাস্টার্ড আপেল রপ্তানি করে এবং ইরাক, জর্ডান ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে পণ্য পাঠানোর জন্য সিরীয় ভূখণ্ডকে স্থলপথ হিসেবে ব্যবহার করে।

গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে লেবাননের বেশ কিছু কৃষিপণ্যের রপ্তানি ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। গত জুনে সৌদি বাজার পুনরায় চালু হওয়া এবং আগস্টে সিরিয়ার সাথে মাসনা সীমান্ত ক্রসিং দিয়ে স্থল পরিবহন চালুর ফলে এই পরিস্থিতির উন্নতি হয়। ফলের চালানে মাদক জব্দের পর সৌদি আরব ২০২১ সালে লেবাননের পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তবে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং আধুনিক ট্রাক তল্লাশি ব্যবস্থার মাধ্যমে এই বাণিজ্য আবার শুরু হয়েছে।

তুরস্কও লেবাননকে সহযোগিতা করছে বলে জানান কৃষিমন্ত্রী এবং উল্লেখ করেন যে একটি যৌথ কৃষি চুক্তি স্বাক্ষরের কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে। তুর্কি কর্মকর্তাদের সাথে সরবরাহ, চারা ও কারিগরি দক্ষতা নিয়ে আলোচনার পর বৈরুত কৃষি উন্নয়নে আঙ্কারার সহায়তা চেয়েছে।

banner
Link copied!