বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি এবং জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার কারণে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মার্কিন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে রয়টার্স এবং আল জাজিরা জানিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের ওপর, যা আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারকে চরমভাবে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিস বৃহস্পতিবার তাদের সর্বশেষ সামষ্টিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১.৫ শতাংশ। অথচ চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২.১ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেশের সার্বিক কাঠামোর ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির সার্বিক ধীরগতির মধ্যেও এই প্রান্তিকে ভোক্তাদের ব্যক্তিগত ব্যয়ের পরিমাণ ৩.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা এর পেছনে দুটি ভিন্ন কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন প্রণীত `ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট`-এর আওতায় সাধারণ নাগরিকরা বড় অঙ্কের কর ফেরত বা ট্যাক্স রিফান্ড পেয়েছেন, যা তাদের ব্যয় করার ক্ষমতা সাময়িকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ ভোক্তাদের এই অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি বড় অংশ বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে খরচ হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ মূল্যস্ফীতি পরিমাপের জন্য ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় বা পিসিই সূচককে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। সর্বশেষ প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে এই সূচক ৩.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফেডারেল রিজার্ভ দীর্ঘদিন ধরে সুদের হার নিয়ে যে কৌশলগত চেষ্টা চালিয়ে আসছিল, এই পরিসংখ্যান সেই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে।
জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় সরাসরি বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিদিনের জ্বালানি তেলের দাম পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন বা ৩.৭৮ লিটার পেট্রোলের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪.০৯ মার্কিন ডলার। গত মাসেও এই দাম ছিল ৩.৮৪ মার্কিন ডলার। বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এই দাম বৃদ্ধির পেছনের কারণটি স্পষ্ট হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল প্রথমবার ইরানের ওপর সম্মিলিত সামরিক হামলা চালিয়েছিল, তখন প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ছিল মাত্র ২.৯৮ মার্কিন ডলার।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই ধীরগতির মধ্যেও প্রযুক্তি খাতে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ বাজারকে কিছুটা হলেও ধরে রেখেছে। সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ ফেলো র্যাচেল জিয়েম্বা আল জাজিরাকে জানান যে, সামগ্রিকভাবে মার্কিন অর্থনীতি এখনো প্রযুক্তি খাতের নতুন বিনিয়োগের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে এই খাতের বিশাল আমদানিনির্ভরতা দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত বাড়াতেও নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি বাজার সূত্রে জানা গেছে, প্রযুক্তি জায়ান্ট এনভিডিয়া ওপেনএআই প্রতিষ্ঠানে ২৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রযুক্তি খাতে এই বিশাল অঙ্কের অর্থায়ন কতদিন মূল অর্থনীতিকে টেনে নিতে পারবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই এই খাতের চক্রাকার অর্থায়ন বা সার্কুলার ফাইন্যান্সিং নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন। যা কম স্পষ্ট তা হলো, জ্বালানি সংকট ও বাণিজ্য ঘাটতির মতো মৌলিক কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান না করে কেবল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর ভর করে মার্কিন অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে এই বিশাল চাপ কতদিন সামলাতে পারবে।
