বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

মধ্য এশিয়ার অর্থনীতি

তাজিকিস্তানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আড়ালে ঋণের ঝুঁকি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ১১:১২ পিএম

তাজিকিস্তানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আড়ালে ঋণের ঝুঁকি

চলতি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে তাজিকিস্তানের মোট দেশজ উৎপাদন বার্ষিক আট দশমিক দুই শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি দেশটির স্থায়ী মূলধনী বিনিয়োগ বেড়েছে আঠারো দশমিক চার শতাংশ, যা মধ্য এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম দ্রুতগতির সম্প্রসারণ। গত জুন মাসে দেশটির প্রধান জাতীয় অবকাঠামো রোগুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বিশ্বব্যাংক অতিরিক্ত ত্রিশ কোটি মার্কিন ডলারের আর্থিক অনুদান অনুমোদন করেছে। তবে দৃশ্যমান এই সমৃদ্ধির পেছনে বৈদেশিক ঋণের বোঝা ও প্রবাসী আয়ের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা দেশটির সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক জটিল কাঠামোগত ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও তাজিকিস্তানকে এখনও ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রেখেছে বিশ্বব্যাংক।

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির এই চমকপ্রদ উন্নয়ন পরিসংখ্যান একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গত ২০২৫ সালে দেশটির মোট উৎপাদন আট দশমিক চার শতাংশ বাড়লেও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ কার্যত সংকুচিত হয়েছে। এই অর্থনীতির বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস মূলত বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ, যা বিদায়ী বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ছেচল্লিশ শতাংশে পৌঁছেছিল। অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান তালকোর মতো বৃহৎ কারখানা থাকা সত্ত্বেও রপ্তানি আয় অত্যন্ত সীমিত। ফলে রাশিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বা অভিবাসন নীতিতে কোনো বড় পরিবর্তন এলে দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য একযোগে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অবশ্য গত দেড় দশকে দেশটির অভ্যন্তরীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈদেশিক মুদ্রার মজুদে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী দিনে চার ডলার বিশ সেন্টের নিচে আয় করা দরিদ্র মানুষের হার ২০১০ সালের পঞ্চান্ন শতাংশ থেকে কমে পনেরো শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে বর্তমানে পাঁচ দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে, যা দিয়ে আট মাসের বেশি সময়ের পণ্য আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। কিন্তু একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় আয়ের পঁয়ত্রিশ শতাংশে। স্থানীয় উৎপাদনশীল শিল্পখাত গড়ে না ওঠায় সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন ভোগের বড় অংশই আমদানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

এদিকে ঐতিহাসিক রোগুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে দেশটির ঋণের সমীকরণ নতুন রূপ নিচ্ছে।

এই মেগা প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে বছরে চৌদ্দ হাজার চারশ গিগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, যা বর্তমান জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ষাট শতাংশ। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে বিশ্বব্যাংকের মোট পঁয়ষট্টি কোটি ডলারের অনুদান ছাড়াও অন্যান্য আঞ্চলিক সংস্থার সহায়তার ওপর প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। স্বাধীন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে স্থায়ী বাণিজ্যিক চুক্তি ছাড়া এই ভবিষ্যৎ আয় দিয়ে এখনই সরকারি ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তা পাওয়া অসম্ভব।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর গোপন ও অফ-বাজেট দেনা নিয়ে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, সরাসরি সরকারি সার্বভৌম ঋণের হার কিছুটা কমলেও রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের আর্থিক দায় জিডিপির প্রায় এগারো দশমিক সাত শতাংশের সমান। বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা বারকি তজিকের আর্থিক ঘাটতি এবং অ্যালুমিনিয়াম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তালকোর বৈদেশিক দায় এই চাপকে তীব্র করে তুলেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে তালকোর বিরুদ্ধে ত্রিশ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণের রায় থাকায় নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আগস্ট মাসে আঞ্চলিক সংস্থা ইউরেশিয়ান ফান্ড ফর স্ট্যাবিলাইজেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট থেকে বিশ কোটি ডলারের দীর্ঘমেয়াদি সহজ ঋণ নিয়ে তাৎক্ষণিক চাপ সামলানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই ক্ষণস্থায়ী স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে না।

banner
Link copied!