সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

গোপন আর্থিক নথি

রোমান আব্রামোভিচের করফাঁকি: প্রকাশ পেল গোপন নথি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : অক্টোবর ১২, ২০২৬, ০৮:২৮ পিএম

রোমান আব্রামোভিচের করফাঁকি: প্রকাশ পেল গোপন নথি

রাশিয়ার শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ী রোমান আব্রামোভিচের শত শত কোটি ডলারের সম্পদ আড়াল ও করফাঁকির সুবিধার্থে আন্তর্জাতিক হিসাবরক্ষণ সংস্থা ডিলয়েটের সাইপ্রাস শাখা ভুয়া নথিপত্র তৈরিতে সহায়তা করেছিল বলে এক যৌথ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ফাঁস হওয়া গোপন নথির বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক তদন্তে দাবি করা হয়েছে, পেছনের তারিখ ব্যবহার করে তৈরি করা এসব হিসাবের কারণে অন্তত ৬৭ কোটি ২০ লাখ ডলার মূল্যের সম্পদ সাইপ্রাসের করপোরেট তালিকা থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। এর মধ্যে বিলাসবহুল সুপারইয়ট, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অট্টালিকা এবং ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। পুরো প্রক্রিয়ায় আব্রামোভিচের সাইপ্রাসভিত্তিক করপোরেট সহযোগীদের সঙ্গে কাজ করেছিল সংশ্লিষ্ট অডিট প্রতিষ্ঠানটি।

আদালতের কোনো বিচারিক রায় ছাড়া এটি এখনো একটি উন্মোচিত অভিযোগ।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক যৌথ অনুসন্ধানী দলের পর্যালোচিত নথি অনুযায়ী, অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত এই ব্যবস্থায় পেছনের তারিখ বসিয়ে সম্পদ হস্তান্তরের চুক্তি তৈরি করা হয়েছিল। যুক্তরাজ্যের আর্থিক পরিষেবা আইনের বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার অ্যান্ড্রু মিচেল এই প্রক্রিয়াকে সরাসরি করফাঁকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদি এই ধরনের কর্মকাণ্ড যুক্তরাজ্যে ঘটত তবে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষ নিশ্চিতভাবেই ফৌজদারি মামলার উদ্যোগ নিত। তার মতে, নথিপত্র তৈরির মাধ্যমে আইন ও পেশাগত বিধিমালার গুরুতর ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে।

তবে রোমান আব্রামোভিচের আইনজীবীরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, আব্রামোভিচ কর ফাঁকি দেননি কিংবা কোনো সম্পদও গোপন করেননি। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, কোনো ভুয়া নথি তৈরির বিষয়ে আব্রামোভিচের অনুমোদন বা নির্দেশনার কোনো প্রমাণ নেই এবং তিনি এসব প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করতেন না। পেশাদার উপদেষ্টাদের পরামর্শের ওপর তার নির্ভর করা সম্পূর্ণ বৈধ ছিল বলেও দাবি করা হয়। ডিলয়েট সাইপ্রাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা সব সময় প্রচলিত আইন মেনেই কাজ করে। তবে উল্লেখিত নথিপত্র ২০ বছরেরও বেশি পুরনো হওয়ায় এবং তা সংরক্ষিত না থাকায় সুনির্দিষ্ট বিষয়ে তারা মন্তব্য করতে পারছে না।

তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, রোমান আব্রামোভিচ প্রায় দুই দশক ধরে লন্ডনের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ২০০৩ সালে চেলসি ফুটবল ক্লাব কেনার পর ক্লাবের সফলতম সময় পার হয়। কিন্তু ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর ব্রিটিশ সরকার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং তাকে ফুটবল ক্লাবটি বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। বর্তমানে তিনি কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা না থাকা তুরস্কে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জের জার্সিতে আব্রামোভিচের প্রায় ৫৪০ কোটি পাউন্ড মূল্যের সম্পদ এখনো জব্দ অবস্থায় রয়েছে এবং সেখানে চার বছর ধরে একটি আইনি তদন্ত প্রক্রিয়াধীন। এই তদন্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আব্রামোভিচের আইনজীবীরা দাবি করেছেন।

সাইপ্রাসের লিমাসলভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেরিটসার্ভাস থেকে পরিচালিত অফশোর নেটওয়ার্কের ১৯৯৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত কয়েক হাজার নথি ফাঁসের ঘটনায় আব্রামোভিচের বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ চিত্র উন্মোচিত হয়। মেরিটসার্ভাস প্রতিষ্ঠানটি ২০০৫ সাল পর্যন্ত ডিলয়েটের নিজস্ব মালিকানাধীন ছিল। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠান দুটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আলাদা হলেও আব্রামোভিচের আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় তারা একে অপরের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে কাজ চালিয়ে যায়। ২০০৬ সালে সাইপ্রাসে নতুন একটি আইন কার্যকর হয়, যার অধীনে কোম্পানির আর্থিক হিসাব জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়। এই স্বচ্ছতা আইন এড়াতেই সম্পদ গোপন করার কৌশল নেওয়া হয়েছিল বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়।

আইনটি কার্যকরের মুখে সাইপ্রাসের আমিস্কান ইনভেস্টমেন্টস নামের প্রতিষ্ঠানের ২০০৩ সালের খসড়া হিসাবে ৬৭ কোটি ২০ লাখ ডলারের সম্পদ নথিভুক্ত ছিল। এর মধ্যে পশ্চিম সাসেক্সের রাজপ্রাসাদতুল্য বাড়ি, লন্ডনের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলের এস্টেট এবং প্রায় ১৫ কোটি ডলার মূল্যের পেলোরাস নামের সুপারইয়ট অন্তর্ভুক্ত ছিল। মেরিটসার্ভাস এবং ডিলয়েট সাইপ্রাস মিলে সম্পদগুলো ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে থাকা প্যারেন্ট কোম্পানিতে স্থানান্তর দেখানোর নথিপত্র তৈরি করে এবং তার কার্যকর তারিখ ২০০৩ সালে পেছনের দিকে নির্ধারণ করে। ফলে ২০০৬ সালে যখন চূড়ান্ত নিরীক্ষা অনুমোদিত হয়, তখন আমিস্কানের নথিতে ওই বিপুল সম্পদের পরিবর্তে মাত্র ৭৫ হাজার ডলারের সম্পদ দেখানো হয়।

শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক লর্ড প্রেম সিক্কা এটিকে সংবিধিবদ্ধ দায়িত্বের মারাত্মক লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

একই কৌশলে করফাঁকির আরেকটি নজির দেখা যায় ক্র্যাভিন ইনভেস্টমেন্টস নামের সাইপ্রাসের প্রতিষ্ঠানে, যার ব্যাংক হিসাবে ২০০৩ সালে প্রায় ২০০ কোটি ডলার জমা ছিল। ওই আমানত থেকে অর্জিত বিশাল সুদের বিপরীতে সাইপ্রাস সরকারকে কর দেওয়ার বিধান থাকলেও ২০০৫ সালের আগস্টে পেছনের তারিখের নথি তৈরি করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, ক্র্যাভিন কেবল ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের মূল প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অর্থটি ধরে রেখেছিল এবং তাদের কোনো নিজস্ব আয় নেই। ডিলয়েটের সঙ্গে আলোচনার পর এই হিসাব পরিবর্তন করা হয় বলে ইমেইলে উল্লেখ রয়েছে। এর মাধ্যমে সাইপ্রাসের কোষাগারকে লাখ লাখ ডলারের কর থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ তৈরি করা হয়। সাইপ্রাসের সংসদ সদস্য ক্রিস্টোস ক্রিস্টোফিডিস জানিয়েছেন, করফাঁকি হয়ে থাকলে জনগণের অর্থ পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

সবচেয়ে বড় অঙ্কের গোপনকরণ ঘটেছে ইলেক্টাস ইনভেস্টমেন্টস নামের সাইপ্রাসভিত্তিক কোম্পানিতে, যার অধীনে এক হাজার কোটি ডলারেরও বেশি আর্থিক সম্পদ ছিল। ২০০৬ সালের অভ্যন্তরীণ চিঠিপত্রে স্বীকার করা হয়েছিল যে সম্পদটি সাইপ্রাস প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় ছিল। কিন্তু সেখানেও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে একই নামের আরেকটি কোম্পানি খুলে পেছনের তারিখ অর্থাৎ ২০০৩ সালের ২০ নভেম্বর মালিকানা হস্তান্তরের চুক্তি তৈরি করা হয়। ফলে সাইপ্রাসে যখন কোম্পানিটির হিসাব প্রকাশ করা হয়, তখন তার সম্পদের মূল্য দেখানো হয় মাত্র এক লাখ ৪৫ হাজার ডলার। রাশিয়ার সাবেক উপ-জ্বালানি মন্ত্রী ভ্লাদিমির মিলোভ মন্তব্য করেছেন, প্রভাবশালী অলিগার্কদের ভাবমূর্তি পরিচ্ছন্ন রাখতে পশ্চিমা আর্থিক ও আইনি পরামর্শকদের একটি বড় নেটওয়ার্ক সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে। সাইপ্রাস কনফিডেনশিয়াল নথিপত্র ফাঁসের পর মেরিটসার্ভাস তাদের করপোরেট কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।

banner
Link copied!