মহাসাগরের তলদেশের অন্যতম রহস্যময় এবং দীর্ঘজীবী প্রাণী গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গরকে নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। চারশো বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে সক্ষম এই বিরল প্রজাতিটি সম্পর্কে নতুন করে তথ্য উদঘাটনের সুযোগ তৈরি হয়েছে আয়ারল্যান্ডের উপকূলে একটি মৃত হাঙ্গর ভেসে আসার মধ্য দিয়ে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে দেশটির কাউন্টি স্লাইগো উপকূলের মেঘাচ্ছন্ন সৈকতে সামুদ্রিক গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবকরা এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পান। আয়ারল্যান্ডে এর আগে কখনো কোনো গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গর ভেসে আসার রেকর্ড ছিল না, যা এই ঘটনাকে বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
উদ্ধারকৃত ধূসর-বেজ বর্ণের প্রাণীটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় তিন মিটার এবং ওজন ছিল দুইশ কেজিরও বেশি। সামুদ্রিক বিজ্ঞানীদের মতে, এই হাঙ্গরটির বয়স দেড় শ বছরের বেশি ছিল। ভিক্টোরিয়ার আমল বা আব্রাহাম লিংকনের সময়কালে জন্ম নেওয়া এই প্রাণীটির জীবনকাল মানব ইতিহাসের এক বিশাল অংশ প্রত্যক্ষ করেছে। অথচ গ্রিনল্যান্ড হাঙ্গরের জীবনকাল সাধারণত চারশো বছর পর্যন্ত হতে পারে বিবেচনায় এই বয়সটিকে গবেষকরা তরুণ বলেই মনে করছেন। আয়ারল্যান্ড হেইল অ্যান্ড ডলফিন গ্রুপের এক সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী জানিয়েছেন যে প্রাণীটির প্রজননক্ষম হওয়ার সময় আসলেও শেষ পর্যন্ত তার সেই সুযোগ হয়নি।
পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরুদণ্ডী প্রাণী হিসেবে পরিচিত এই হাঙ্গরগুলো উত্তর আটলান্টিক এবং আর্কটিক মহাসাগরের ঠান্ডা ও অন্ধকার জলে বসবাস করে। অতিশয় ধীরগতির সাঁতারু এই প্রাণীগুলো মূলত মৃত সামুদ্রিক প্রাণীর অবশিষ্টাংশ খেয়ে বেঁচে থাকে। তবে তারা মাঝেমধ্যে সিল মাছের মতো দ্রুতগামী শিকারও কৌশলে ধরে ফেলতে পারে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। তাদের মুখে থাকা শক্তিশালী শোষক ক্ষমতার কারণে তারা আস্ত শিকার গিলে খেতে সক্ষম। আর্কটিকের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় বেঁচে থাকার জন্য তাদের শরীরে বিশেষ রাসায়নিক যৌগ কাজ করে যা প্রাকৃতিক অ্যান্টিফ্রিজ হিসেবে ভূমিকা রাখে।
হাঙ্গরটির মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে এবং এর অভ্যন্তরীণ গঠন পর্যবেক্ষণে ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব আয়ারল্যান্ডের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ দল ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে। অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে পরিচালিত এই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় গবেষকরা হাঙ্গরটির শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পরিমাপ করেন এবং টিস্যু সংগ্রহ করেন। বিশেষ করে প্রাণীটির চোখ থেকে লেন্স সংগ্রহ করা হয়েছে যা পরবর্তীতে রেডিওকার্বন ডেটিং পদ্ধতির মাধ্যমে এর সঠিক বয়স নির্ধারণে সহায়তা করবে। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো যে এই হাঙ্গরগুলোর দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত দুর্বল বা তারা অন্ধ হয়, তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে তাদের চোখ মৃদু আলোতেও দেখার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিশাল সামুদ্রিক প্রাণীদের প্রজনন ক্ষেত্র এবং জন্মস্থান সম্পর্কে এখনও অনেক অজানা তথ্য রয়ে গেছে। গবেষকরা এখনো নিশ্চিত নন যে এরা প্রতিবারে কতটি ছানা প্রসব করে বা কত ঘন ঘন প্রজনন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। সঠিক তথ্যের অভাবে এই প্রজাতিটিকে রক্ষা করা এবং তাদের ওপর মাছ ধরার জালের প্রভাব মূল্যায়ন করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। আয়ারল্যান্ডের এই অপ্রত্যাশিত ঘটনা গবেষকদের সামনে এমন এক সোনালী সুযোগ এনে দিয়েছে যার মাধ্যমে মহাসাগরের গভীরের এই রহস্যময় প্রাণী সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার পথ সুগম হয়েছে।
