দাম্পত্য কলহ ও সম্পর্কের জটিলতা মানুষের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র বাদানুবাদ ও দীর্ঘদিনের বিষাক্ত সম্পর্ক নিদ্রাহীনতার পাশাপাশি হৃদযন্ত্র এবং মাংসপেশির ব্যথার মতো শারীরিক ব্যাধির কারণ হতে পারে। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি শিশুদের মানসিক বিকাশেও এটি বড় ধরনের সংকট তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্বাস্থ্যকর সম্পর্কের ক্ষতিকর প্রভাব ধূমপান বা শারীরিক ব্যায়ামের ঘাটতির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, যা মানুষের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দেয়।
সুখী সম্পর্ক মানুষের আয়ু বাড়ায়।
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে চারটি ধ্বংসাত্মক আচরণকে দায়ী করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের গটম্যান ইনস্টিটিউটের গবেষক ও মনোবিজ্ঞানী ক্যারি কোল। এই আচরণগুলো হলো সঙ্গীর প্রতি নিয়মিত তীব্র সমালোচনা, অবজ্ঞা প্রদর্শন, সবসময় আত্মপক্ষ সমর্থন করার প্রবণতা এবং বিবাদের সময় নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে রাখা। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, সঙ্গীর কাছ থেকে ক্রমাগত তিক্ত সমালোচনা পাওয়ার কারণে মানুষের অকালমৃত্যুর সম্ভাবনা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। তবে দম্পতিরা আন্তরিকভাবে চাইলে পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
মনোবিজ্ঞানী জন গটম্যানের একটি দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে, চার বছর আগের সম্পর্কের বিবাদ মূল্যায়নে যেসব অমীমাংসিত বিষয় ছিল, ৬৯ শতাংশ দম্পতির ক্ষেত্রে পরবর্তী বছরগুলোতেও ঠিক একই ধরনের বিতর্ক চলতে থাকে। পারিবারিক জীবনে অর্থ খরচ ও গৃহস্থালি কাজের অসম বণ্টন সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত বিবাদের জন্ম দেয়, যা একপর্যায়ে বিবাহবিচ্ছেদের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অথচ গৃহস্থালির দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং সম্মানজনক গঠনমূলক আলোচনা দীর্ঘমেয়াদী দাম্পত্য জীবনকে আরও দৃঢ় করতে সাহায্য করে।
সম্পর্কের ক্ষেত্রে পেশাদার থেরাপি শতকরা ৭০ ভাগ দম্পতির ইতিবাচক রূপান্তরে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যামিলি ইনস্টিটিউটের ক্লিনিক্যাল অধ্যাপক ও থেরাপিস্ট জে লেবো জানান, যখন কোনো জুটি সম্পর্ক বাঁচাতে থেরাপির শরণাপন্ন হয়, তখন তাদের ভেতরের পারস্পরিক সহমর্মিতা প্রায় শেষ হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে পরস্পরকে মন দিয়ে শোনা এবং বুঝতে শেখার দক্ষতাটি নতুন করে তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়ে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বের সেরা বিশেষজ্ঞ দিয়েও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় যদি স্বামী ও স্ত্রীর নিজেদের সংকট সমাধানের আন্তরিক ইচ্ছা না থাকে।
থেরাপির সময় দুটি লক্ষণ সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের ইতিবাচক পূর্বাভাস দেয়। প্রথমটি হলো ভিন্ন মত থাকা সত্ত্বেও সঙ্গীর অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, এবং দ্বিতীয়টি হলো অপর পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গির পেছনের যুক্তি জানার আন্তরিক কৌতূহল ধরে রাখা।
আর্থিক সংকটের অতীতে বেড়ে ওঠা একটি দম্পতির উদাহরণ টেনে বিশেষজ্ঞরা জানান, সঞ্চয় বনাম ব্যয়ের ভিন্ন মানসিকতা বিবাদের কারণ হলেও পেছনের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা বুঝতে পেরে তারা বাজেট সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন। এমনকি যেসব ক্ষেত্রে বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়, সেখানেও পেশাদার পরামর্শের মাধ্যমে বৈরিতা কমিয়ে আনা সম্ভব। এর ফলে বাবা-মা আলাদা হলেও সন্তানদের মানসিক সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সহজ হয়।
