দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম দুর্গম জনপদ ট্রিস্টান ডা কুনহা দ্বীপে এক ব্রিটিশ নাগরিকের জীবন বাঁচাতে নজিরবিহীন এক অভিযানে অংশ নিয়েছে যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনী। হ্যান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহে থাকা ওই ব্যক্তির জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে প্যারাশুটে করে দ্বীপে নেমেছেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শনিবার এই বিরল অভিযানের তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় এমভি হোন্ডিয়াস নামক একটি প্রমোদতরি থেকে। ওই প্রমোদতরিটিতে সম্প্রতি হ্যান্টাভাইরাসের একটি মারাত্মক প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তি মূলত ট্রিস্টান ডা কুনহা দ্বীপেরই স্থায়ী বাসিন্দা। গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে তিনি জাহাজটি থেকে নেমে নিজ দ্বীপে ফিরে আসেন। তবে জাহাজ ছাড়ার দুই সপ্তাহ পর তার শরীরে ভাইরাসের উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। বর্তমানে তাকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে এবং তার অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানা গেছে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৬ এয়ার অ্যাসল্ট ব্রিগেডের ছয়জন প্যারাট্রুপার এবং দুজন অভিজ্ঞ ক্লিনিশিয়ান এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন। তারা আরএএফ ব্রিজ নর্টন থেকে উড়ে গিয়ে আকাশপথেই দ্বীপে অবতরণ করেন। মূলত ট্রিস্টান ডা কুনহায় কোনো বিমানবন্দর বা রানওয়ে না থাকায় প্যারাশুট ব্যবহার করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং তীব্র বাতাসের মধ্যে এই অভিযান পরিচালনা করা সেনাসদস্যদের জন্য ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই অভিযানের গুরুত্ব তুলে ধরে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র সচিব ইভেট কুপার জানিয়েছেন, ব্রিটিশ নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। বিশেষ করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে থাকা ওভারসিজ টেরিটরি বা ব্রিটিশ নাগরিকদের বিপদে পাশে দাঁড়াতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এটিই প্রথমবার যখন যুক্তরাজ্যের সামরিক বাহিনী কোনো মানবিক সহায়তার প্রয়োজনে প্যারাশুটে করে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল পাঠাল।
হ্যান্টাভাইরাস সাধারণত ইঁদুর বা এই জাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। তবে বর্তমানে যে ‘আন্দিজ স্ট্রেইন’ চিহ্নিত করা হয়েছে, তা মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে সক্ষম। প্রমোদতরি এমভি হোন্ডিয়াস বর্তমানে স্পেনের তেনেরিফে দ্বীপে অবস্থান করছে। জাহাজটিতে এখন পর্যন্ত ছয়জন আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুজনের শরীরে হ্যান্টাভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ট্রিস্টান ডা কুনহা দ্বীপটির জনসংখ্যা মাত্র ২২১ জন। এই ছোট জনপদে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় রয়্যাল এয়ার ফোর্সের একটি বিমান থেকে জরুরি অক্সিজেন সিলিন্ডার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রও ফেলা হয়েছে। দ্বীপটিতে সাধারণত মাত্র দুজন চিকিৎসা কর্মী থাকেন, যা এমন একটি সম্ভাব্য মহামারীর ঝুঁকি মোকাবিলায় যথেষ্ট ছিল না। সেনাদলের এই সহায়তা দ্বীপবাসীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত ওই ব্যক্তি গত ২৮ এপ্রিল প্রথম ডায়রিয়ার সমস্যার কথা জানান এবং এর দুদিন পর তার শরীরে প্রচণ্ড জ্বর আসে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে এমভি হোন্ডিয়াস জাহাজ থেকে আরও ১০০ জনকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা চলছে। তবে ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরিচালনা করা হচ্ছে।
