প্রতিদিন সকাল নটার দিকে পাঁচ সন্তানের প্রয়োজনীয়তা মিটিয়ে আল-আমাল ক্যাম্পের তাবু থেকে বেরিয়ে আসেন উলা সালেহ নামের এক নারী। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পর তিনি ক্যাম্পের অন্য একটি তাবুতে পৌঁছান এবং কয়েক ঘণ্টার জন্য মাতৃত্বের কঠিন দায়িত্ব, বাস্তুচ্যুতি ও শোকের যন্ত্রণা থেকে কিছুটা দূরে সময় কাটান। আল জাজিরার প্রতিবেদনে প্রকাশ যে এটি নারীদের জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ স্থান, যেখানে যুদ্ধের চাপ সামলানোর জন্য মানসিক সহায়তা, দলীয় আলোচনা এবং ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। কালেক্টিভ ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টস নামের একটি সংস্থার উদ্যোগে এই বিশেষ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
এখানে আসার পর উলা সালেহ এমন কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান যারা তার মনের কথাগুলো কোনো দীর্ঘ ব্যাখ্যা ছাড়াই বুঝতে পারেন। মনোবিজ্ঞানী এবং স্বজন হারানোর যন্ত্রণায় কাতর নারীদের মাঝে তিনি এমন এক স্বস্তি খুঁজে পান যা ইসরায়েলি আগ্রাসনের পর থেকে তিনি আর কোথাও পাননি। গত আগস্ট মাসে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার সময় এক হামলায় তার স্বামী নিহত হন। তারপর থেকেই পাঁচ সন্তানকে নিয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটছে তার। জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থার তথ্যমতে, যুদ্ধের সূচনা থেকে গাজায় হাজার হাজার নারী স্বামী হারিয়েছেন এবং প্রতি সাতটি পরিবারের একটির প্রধান এখন একজন নারী।
বেশিরভাগ নারীর জন্যই শোক প্রকাশ করার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ বা সময় নেই। বিদ্যুৎ বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ছাড়াই তাবুতে বসবাসকারী এই নারীরা প্রতিদিনের খাবার, পানি এবং বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতেই ব্যস্ত থাকেন। নারীদের এই নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের মাঠ সমন্বয়কারী আলা দাউদ জানিয়েছেন যে নারীরা যাতে স্বাধীনভাবে নিজেদের প্রকাশ করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা পেতে পারেন, সেজন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মধ্য গাজার একটি স্কুলে এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে এবং ধীরে ধীরে গাজার অন্যান্য অঞ্চলেও এটি প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার পাশাপাশি এই সেশনগুলোতে পারিবারিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট এবং বাস্তুচ্যুতির সময় সন্তানদের লালন-পালনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্রথম দিনে ষাট জন নারী এই কার্যক্রমে অংশ নিলেও বর্তমানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উলা সালেহ জানিয়েছেন যে এই নিরাপদ স্থানটি তার শোক মুছে না দিলেও তা সহ্য করার শক্তি জোগায়। প্রতিদিনের এই সাক্ষাৎগুলো তাকে বেঁচে থাকার নতুন আশা এবং ইতিবাচক শক্তি দেয়। তিনি অনুভব করেন যে এই নিষ্ঠুর যুদ্ধের মাঝেও তার নিজস্ব একটি সত্তা ও গুরুত্ব রয়েছে।
এই একই কার্যক্রমে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে অংশ নেন তেষট্টি বছর বয়সী সুয়াদ আল-ঘরাবালি। গাজা সিটির শুজাইয়া এলাকার বাসিন্দা সুয়াদ তার নিজের ঘরবাড়ি হারিয়ে বর্তমানে দেলোর আল-বালাহের একটি তাবুতে বসবাস করছেন। যুদ্ধের এই ভয়াবহতা তার জীবন থেকে দুটি তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে; বিমান হামলায় তার দুই তরুণ ছেলেই নিহত হয়েছেন। এত বড় শোক বুকে নিয়েও তিনি তরুণ মায়েদের সন্তান লালন-পালন ও জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে নানা পরামর্শ দেন। সুয়াদের মতে, বর্তমান প্রজন্মের তরুণ মায়েদের সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের দিকনির্দেশনা খুবই প্রয়োজন।
আলা দাউদ মনে করেন যে এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো কেবল কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যম নয়, বরং গাজার নারীদের অসাধারণ ত্যাগের স্বীকৃতি দেওয়ার একটি বড় মাধ্যম। যুদ্ধের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও গাজার নারীরা চরম দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি এবং বিশাল মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়েছেন। তাদের সেই অবদান এবং কষ্টকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমেই তাদের মুখে একটু হাসির রেখা ফোটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই ছোট্ট উদ্যোগটি গাজার নারী সমাজের জীবনযাত্রায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
