লেবানন যুদ্ধে ইসরায়েলের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং একাধিক প্রধান প্রতিরক্ষা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে একটি যৌথ দেওয়ানি মামলা দায়ের করেছেন কয়েক ডজন লেবানন-আমেরিকান নাগরিক। আল জাজিরা এবং এএফপি জানিয়েছে যে এই মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের একটি ফেডারেল আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা হয়েছে। মামলার মূল অভিযোগে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রশাসন এমন একটি বিদেশি সরকারকে সামরিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করে বারবার ভয়াবহ অপরাধ ঘটাচ্ছে, যা মার্কিন স্বরাষ্ট্র ও বৈদেশিক আইনের পরিপন্থী।
মামলার নথিতে অভিযুক্তদের তালিকায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন, বোয়িং এবং ক্যাটারপিলারের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই আইনি পদক্ষেপে বাদীপক্ষ হিসেবে রয়েছে মিশিগানভিত্তিক আরব আমেরিকান সিভিল রাইটস লিগ নামক মানবাধিকার সংগঠন এবং ষোল জন ব্যক্তিগত নাগরিক। এই নাগরিকরা প্রত্যেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং লেবাননে তাদের নিজস্ব সম্পত্তি রয়েছে, যা সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীদের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে মিশিগানের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নাসের বেদৌন এই মামলায় যুক্ত হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে দক্ষিণ লেবাননের বিন্ত জুবাইল এলাকায় অবস্থিত তার পারিবারিক বাড়িটি কোনো ধরনের সামরিক প্রয়োজনীয়তা বা যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। মামলার আইনি যুক্তিতে বলা হয়েছে যে মার্কিন সরকার এই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞে ব্যবহৃত অস্ত্র এবং তহবিল সরবরাহ করে লেহী আইন সরাসরি লঙ্ঘন করছে। এই বিশেষ মার্কিন আইনটি এমন কোনো বিদেশি সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ প্রদান নিষিদ্ধ করে যা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।
প্রতিরক্ষা ঠিকাদার কোম্পানিগুলো জেনেশুনে ইসরায়েলকে অবৈধ সামরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছে বলে বাদীরা অভিযোগ করেছেন এবং অবিলম্বে এই অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। আরব আমেরিকান সিভিল রাইটস লিগের প্রধান এবং আইনজীবী নাবিহ আয়াদ গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে আইনটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হলেও ইসরায়েলের ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে মার্কিন প্রশাসনের নীতিগত পক্ষপাতিত্বের কারণে সাধারণ লেবানন-আমেরিকান নাগরিকরা চরম আইনি ও মানবিক সংকটের মুখে পড়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের দেওয়ানি মামলা মার্কিন বিচার ব্যবস্থায় সরাসরি বড় কোনো পরিবর্তন না আনলেও সরকারের বৈদেশিক নীতির নৈতিক অবস্থানকে তীব্র বিতর্কের মুখে ফেলবে। অতীতেও ফিলিস্তিন ও লেবাননে সংঘটিত সংঘাতের সময় মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে, তবে সরাসরি আদালতের কাঠগড়ায় প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের টেনে আনার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ এবং আদালতের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে পুরো আইনি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ গতিপথ। কী ধরনের আইনি প্রতিকার এই প্রবাসী নাগরিকরা পাবেন তা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মী ও আইনি বিশেষজ্ঞরা এই ঐতিহাসিক মামলার প্রতিটি পদক্ষেপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
