কম্বোডিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি বৌদ্ধ প্যাগোডার প্রাঙ্গণে এগারো বছর বয়সী সোকনার দিন শুরু হয় গৃহস্থালি কাজের মধ্য দিয়ে। যেখানে তার স্কুলে থাকার কথা ছিল সেখানে সে এখন নীল রঙের টারপলিনের তাবুর চারপাশে ধুলোবালি পরিষ্কার করে এবং পানি সংগ্রহ করে সময় কাটায়। থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক সীমান্ত যুদ্ধের কারণে সোকনা এবং তার পরিবারের মতো কয়েক হাজার মানুষ এখন বাস্তুচ্যুত অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। যুদ্ধবিরতি চললেও সীমান্তের উত্তেজনা কমেনি বরং নতুন করে সংঘাত শুরুর আতঙ্কে দিন কাটছে এই পরিবারগুলোর।
কম্বোডিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশটির বিভিন্ন অস্থায়ী শিবিরে ৩৪ হাজার ৪৪০ জনেরও বেশি মানুষ অবস্থান করছে। যার মধ্যে অন্তত ১১ হাজার ৩৫৫ জনই শিশু। সোকনার মা পুথ রেন আল জাজিরাকে জানান যে দীর্ঘ কয়েক বছর থাইল্যান্ডে কাজ করার পর লড়াই শুরু হলে তারা প্রাণ বাঁচাতে কম্বোডিয়ায় পালিয়ে আসেন। এখন সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর চেষ্টা করলেও পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা আর ভয় তাদের বাধা দিচ্ছে। সোকনার মতো হাজার হাজার শিশুর শিক্ষা জীবন এখন পুরোপুরি থমকে গেছে যা দেশিটির ভবিষ্যতের জন্য এক বড় সংকট তৈরি করছে।
সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে কম্বোডিয়ার সেনারা এখন উচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। কোনো কোনো এলাকা থাই বাহিনীর দখলে থাকায় বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো তাদের ভিটেমাটিতে ফিরতে পারছে না। বর্তমানে এই মানুষগুলো মূলত বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির দেওয়া ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। যদিও কম্বোডিয়া সরকার কিছু পরিবারের জন্য কাঠের তৈরি ঘর দেওয়ার পরিকল্পনা করছে তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। অধিকাংশ মানুষই খোলা আকাশের নিচে বা প্লাস্টিকের তাবুতে রাত কাটাচ্ছে যেখানে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নেই।
রাজনৈতিকভাবেও পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত। কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন যে থাইল্যান্ড তাদের ভূখণ্ডের অনেকটা গভীর পর্যন্ত দখল করে রেখেছে। দুই দেশের মধ্যে এই আঞ্চলিক বিরোধ দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও সীমান্তের দুই পাশেই বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন রয়েছে যা স্থানীয়দের মনে স্বস্তি ফেরার পরিবর্তে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। সোকনার মতো শিশুরা জানে না তারা আবার কবে তাদের পড়ার টেবিলে ফিরতে পারবে কিংবা কবে তারা একটি স্থায়ী ঘর পাবে।
বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম যখন তেল সংকট বা সাইবার অপরাধের মতো বড় ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত ঠিক তখন এই সীমান্ত যুদ্ধের বলি হওয়া মানুষগুলোর কথা অনেকটাই আড়ালে পড়ে থাকছে। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো বলছে যে শিশুদের শিক্ষার এই বিচ্ছেদ তাদের দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ট্রমার দিকে ঠেলে দিতে পারে। কম্বোডিয়ার অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত এই সংকটের কোনো দ্রুত সমাধান আপাতত দেখা যাচ্ছে না। যতদিন না দুই দেশের সরকার একটি স্থায়ী এবং শান্তিপূর্ণ সীমানা নির্ধারণে পৌঁছাতে পারছে ততদিন এই নীল তাবুর জীবনই সোকনাদের ভবিতব্য হয়ে থাকবে।
