ইসলামি সমাজ ব্যবস্থায় ঈদ কেবল আনন্দ, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার মহোৎসবই নয়, বরং এটি পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় ও মজবুত করার এক অনন্য মাধ্যম। ঈদের এই পবিত্র আবহে দূর-দূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের আন্তরিক সমাদর করা ইসলামি সংস্কৃতির এক অনবদ্য সৌন্দর্য। মেহমানকে সম্মান জানানো এবং তাদের খুশিমনে আপ্যায়ন করা কেবল বাহ্যিক সামাজিক ভদ্রতা নয়, বরং এটিকে ঈমান ও উত্তম চরিত্রের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।পবিত্র ইসলামে অতিথি সমাদরের পুরস্কার হিসেবে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
সহীহ বুখারীর ৬০১৮ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মেহমানদারির গুরুত্ব স্পষ্ট করে বলেছেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়, অতিথিকে সমাদর করে এবং ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে। এই বাণী প্রমাণ করে যে, একজন প্রকৃত মুমিন কখনোই অতিথির আগমনে বিরক্ত বা সংকুচিত হন না, বরং একে আল্লাহর বিশেষ রহমত মনে করেন। ইসলামের ইতিহাসের শুরুর দিকেও আমরা দেখি, নবুয়তের কঠিন মুহূর্তে উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবীজিকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তাঁর মেহমানদারির গুণটিকে আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার অন্যতম উসিলা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। সহীহ মুসলিমের ২৯৩ নম্বর হাদিস অনুযায়ী তিনি বলেছিলেন যে, আল্লাহর কসম, তিনি কখনো আপনাকে অপমানিত করবেন না, কারণ আপনি মেহমানদের আন্তরিক সেবা করেন এবং দুর্দশাগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ান।ঈমানের দাবি ও নবীজির মদিনা জীবনের শিক্ষা
মদিনায় হিজরতের পর আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামি রাষ্ট্রের যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, তার অন্যতম স্তম্ভ ছিল মানুষকে খাদ্য দান বা আপ্যায়ন করা। সুনানে তিরমিজির ২৪৮৫ নম্বর হাদিসে বর্ণিত নবীজির প্রথম ঐতিহাসিক নসিহত ছিল যে, হে মানুষ, তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, মানুষকে খাদ্য দান করো এবং মানুষ যখন রাতে ঘুমিয়ে থাকে তখন নামাজ আদায় করো, তবে তোমরা সহিহ-সালামতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অন্য এক বর্ণনায় হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে জানা যায়, জান্নাতে এমন কিছু সুদৃশ্য স্বচ্ছ প্রাসাদ বা বালাখানা রয়েছে যার ভেতর থেকে বাইরের এবং বাইরে থেকে ভেতরের সমস্ত সৌন্দর্য দেখা যায়। নবীজি স্পষ্ট করেছেন যে, এই চমৎকার প্রাসাদগুলো মূলত সেইসব সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের জন্য তৈরি করা হয়েছে যারা মানুষের সাথে সর্বদা নরম ও উত্তম ভাষায় কথা বলে এবং ক্ষুধার্ত মানুষকে পরম মমতায় অন্ন দান করে।আনসার দম্পতির ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ ও ঐশী স্বীকৃতি
মেহমানদারির মাধ্যমে মহান আল্লাহর চূড়ান্ত সন্তুষ্টি অর্জনের এক অনন্য ও ঐতিহাসিক ঘটনা সাহাবিদের জীবনে ঘটেছিল, যা স্বয়ং পবিত্র কোরআনে আয়াতের মাধ্যমে চিরস্মরণীয় করে রাখা হয়েছে। সহীহ বুখারীর ৩৭৯৮ নম্বর হাদিসের বিবরণ অনুযায়ী, এক আনসারি সাহাবির ঘরে রাতে একজন ক্ষুধার্ত মেহমান এলে ঘরে শুধুমাত্র বাচ্চাদের সামান্য খাবার ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সেই সাহাবি ও তার স্ত্রী নিজেদের সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে বাতি নিভিয়ে অন্ধকারের মধ্যে মেহমানকে খাবার পরিবেশন করেন এবং নিজেরা না খেয়ে খাওয়ার ভান করে পুরো রাত অভুক্ত কাটান। এই চরম আত্মত্যাগ দেখে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা খুশি হয়ে সুরা হাশরের ৯ নম্বর আয়াত নাজিল করেন যেখানে বলা হয়েছে, তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও অন্যদের নিজেদের ওপর অগ্রগণ্য করে থাকে এবং যাদের অন্তরের কৃপণতা থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই মূলত সফলতাপ্রাপ্ত।
আজকের এই তীব্র যান্ত্রিক, ব্যস্ত ও চরম আত্মকেন্দ্রিক সামাজিক বাস্তবতায় প্রবীণ মানুষ বা মেহমানরা অনেক সময় অবহেলা ও একাকীত্বের শিকার হন। এই ধরনের পরিস্থিতিতে মেহমানের পাশে বসা, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, সাধ্যানুযায়ী উত্তম আহারের ব্যবস্থা করা এবং স্নেহের সাথে আচরণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য একটি বড় ইবাদত। মায়ের খিদমত যেমন জান্নাতের পথ খুলে দেয়, তেমনি মেহমানের নিঃস্বার্থ সেবা মানুষের জীবনে প্রভূত বরকত, সম্মান ও আল্লাহর বিশেষ রহমত নিয়ে আসে। তাই পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ আমলটিকে অবহেলা না করে এর মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের অফুরন্ত কল্যাণ লুফে নেওয়া উচিত।
