বুধবার, ০৩ জুন, ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসে বড় ভাঙন, কোণঠাসা মমতা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ৩, ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসে বড় ভাঙন, কোণঠাসা মমতা

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের এক মাস পার হতে না হতেই সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও ফাটল এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। দেড় দশক ধরে রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা এই রাজনৈতিক দলটিতে বড় ধরনের ভাঙনের স্পষ্ট আলামত মিলছে। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের দলীয় প্রস্তাবনা পত্রে বিধায়কদের সই জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ওঠার পর দুই নবনির্বাচিত বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জী এবং সন্দীপন সাহাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপের পর দলটির একটি বড় অংশ শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।মমতা ব্যানার্জীর একচ্ছত্র নেতৃত্বের দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই দলে এমন বিপর্যয় নজিরবিহীন।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় নমুনা দেখা গেছে গত রবিবার, যখন দলের সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জী নবনির্বাচিত ৮০ জন বিধায়ককে নিয়ে এক জরুরি পর্যালোচনা বৈঠক ডেকেছিলেন। কিন্তু দলটির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এতটাই ভেঙে পড়েছে যে সেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ৮০ জনের মধ্যে মাত্র ২০ জন বিধায়ক উপস্থিত হয়েছিলেন। এই বিপুলসংখ্যক বিধায়কের অনুপস্থিতি কলকাতার রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী এই পরিস্থিতি নিয়ে কটাক্ষ করে বলেছেন যে, তৃণমূল কংগ্রেস কার্যত এখন একটি উঠে যাওয়া পার্টিতে পরিণত হয়েছে। যদিও মমতা ব্যানার্জী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করেছেন যে তৃণমূলকে ভেঙে ফেলা কখনোই সম্ভব নয়, তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে।

এই গভীর সংকটের সূত্রপাত মূলত বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের একটি নথিতে সই সংক্রান্ত অসঙ্গতিকে কেন্দ্র করে। গত ৬ মে মমতা ব্যানার্জীর কালীঘাটের বাসভবনে বিধায়কদের একটি প্রাথমিক বৈঠক হয়েছিল যেখানে বিধানসভায় জমা দেওয়ার জন্য একটি প্রস্তাবনা পত্রে সকলের সই নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯ মে আবার বৈঠক ডাকা হলে বহু বিধায়ক অনুপস্থিত ছিলেন, কিন্তু দলের পক্ষ থেকে অনুপস্থিত বিধায়কদের সইও ওই কাগজে জালিয়াতির মাধ্যমে বসিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এমনকি সই করার সময় ১৯ মে-র পরিবর্তে ব্যাকডেটে ৬ মে তারিখ লেখার জন্য বিধায়কদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। ঋতব্রত ব্যানার্জী পরবর্তীতে স্বীকার করেন যে, ভয়ের কারণে এতদিন কেউ মুখ না খুললেও নথিতে এমন অনেকের সই রয়েছে যারা আদতে বৈঠকেই উপস্থিত ছিলেন না।

বহিষ্কৃত দুই বিধায়ক ঋতব্রত ও সন্দীপন এই সই জালিয়াতির বিষয়টি সরাসরি বিধানসভার স্পিকারের কাছে গিয়ে লিখিতভাবে জানিয়ে আসার পরেই তাদের দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়। এই ঘটনার পর কলকাতার হেয়ার স্ট্রিট থানায় একটি জালিয়াতির মামলা দায়ের করা হয়, যার তদন্তভার পরবর্তীতে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ সিআইডি-র হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে সিআইডি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও মমতা ব্যানার্জীর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জীকে তলব করলেও তিনি গত সোমবার শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে হাজিরা এড়িয়ে গেছেন। দলের সাধারণ কর্মীদের বড় অংশই এখন অভিষেক ব্যানার্জীর একমুখী সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন।

এদিকে এই রাজনৈতিক ফাটলকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার পদ দাবি করার এক নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। দলটির অধুনা বহিষ্কৃত দুই নেতার সাথে যদি আরও বড় অংশের বিধায়কের সমর্থন যুক্ত হয়, তবে তারা বিধানসভায় নতুন দল বা গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। বিজেপির প্রভাবশালী নেতা তাপস রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইঙ্গিতপূর্ণ এক পোস্টে লিখেছেন যে, তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে এবং এর অবস্থা এখন মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকটের মতো দাঁড়িয়েছে। তিনি দাবি করেন, স্পিকারের কাছে প্রায় ৫০ জন বিধায়ককে সাথে নিয়ে ঋতব্রত ব্যানার্জী পৌঁছে গেছেন এবং রাজ্যে নতুন রাজনৈতিক খেলা শুরু হতে চলেছে। যদিও ঋতব্রত ব্যানার্জী জানিয়েছেন যে মমতা ব্যানার্জীর প্রতি তার শ্রদ্ধা অটুট রয়েছে, তবে স্পিকারের কাছে জালিয়াতির অভিযোগ জানানোর অবস্থান থেকে তিনি ও সন্দীপন পিয়াস পিছপা হবেন না।

কলকাতার প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল না, এটি পুরোপুরি নেত্রী মমতা ব্যানার্জীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে টিকে ছিল। কিন্তু নিজের শক্ত ঘাঁটি ভবানীপুর আসনে খোদ মমতা ব্যানার্জীর শোচনীয় পরাজয়ের পর দলটির দিশেহারা অবস্থা স্পষ্ট ধরা পড়েছে। তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ অন্তত ৫৩ জন যদি দলত্যাগ করেন, তবেই আইনিভাবে বড় ভাঙন নিশ্চিত হবে। তবে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব ইতিমধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে অন্য দল থেকে আসা কাউকে তারা এই মুহূর্তে সরাসরি দলে নেবে না, যার ফলে বিক্ষুব্ধ বিধায়কদের ভবিষ্যৎ কৌশল কোন দিকে যায় তা দেখার বিষয়।

banner
Link copied!