ইসলামি শরিয়তে পর্দার মূল উদ্দেশ্য হলো নারীর শালীনতা রক্ষা করা এবং পরপুরুষের দৃষ্টি থেকে শরীর ও সৌন্দর্যকে আড়াল করা। আধুনিক সময়ে বাজারে বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন করা, রঙিন ও ফ্যাশনেবল বোরকা ও হিজাব পাওয়া যাচ্ছে। এ ধরনের পোশাক পরিধান করা এবং এর ব্যবসা পরিচালনা করা শরিয়তের দৃষ্টিতে কতটুকু বৈধ, তা নিয়ে ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি জানা থাকা জরুরি। ইসলামের পর্দার মূলনীতি হলো শরীর ঢেকে রাখা এবং দৃষ্টি সংযত রাখা। পবিত্র কোরআনের সুরা নূরের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিন নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সুরা আহজাবের ৫৯ নম্বর আয়াতে তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর ঝুলিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফিকহবিদদের মতে, যে পোশাক শরীরকে যথাযথভাবে ঢেকে রাখে এবং পরপুরুষের মনে কু-লালসা সৃষ্টি করে না, তা পর্দার মানদণ্ড পূরণ করে।
ইসলামে নির্দিষ্ট কোনো রঙ বা ডিজাইন বাধ্যতামূলক করা হয়নি। তাই ডিজাইন করা বা রঙিন বোরকা পরিধান করা সরাসরি হারাম বা নিষিদ্ধ নয়। এক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো পোশাকটি শরীরকে যথাযথভাবে ঢেকে রাখছে কি না এবং তা বোরকার আবরণে নিজেকে প্রদর্শন বা তাবাররুজ হিসেবে গণ্য হচ্ছে কি না। যদি কোনো পোশাক শরীরের গঠন প্রকাশ করে কিংবা অতিরিক্ত চকমক বা কারুকার্যের মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফিতনার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে, তবে তা পর্দার মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে নারীরা তাদের চাদর দিয়ে নিজেদের এমনভাবে ঢেকে রাখতেন যে, ফিরে যাওয়ার সময় তাদের চেনা যেত না, যা সহীহ বুখারীর ৩৭২ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, পর্দার পোশাকে অনাড়ম্বরতা ও শালীনতা বজায় রাখাই উত্তম।
ব্যবসার ক্ষেত্রে ফিকহি নীতিমালা অনুযায়ী, গুনাহ তখনই সাব্যস্ত হয় যখন কেউ নিজ ইচ্ছায় সরাসরি গুনাহে অংশগ্রহণ করে। রদ্দুল মুহতারের ৫৬২ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখিত নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজাইন করা বা রঙিন বোরকা ও হিজাব বিক্রি করা জায়েজ। বিক্রেতা ক্রেতার অপব্যবহারের জন্য দায়ী নন, কারণ বোরকা মূলত একটি বৈধ পণ্য এবং এটি শালীনভাবে ব্যবহারেরও ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। গুণাহ মূলত নির্ভর করবে ব্যবহারকারীর নিয়ত ও ব্যবহারের ধরনের ওপর। পোশাকের ব্যবহারের মাধ্যমেই একজন নারী নিজেকে পর্দায় রাখতে পারেন। তবে ব্যবসায়ীদের জন্য ফিকহি সতর্কতা হলো, যে পণ্যের ব্যবহার সাধারণত গুনাহ বা ফিতনার দিকে প্রবলভাবে নিয়ে যায়, তা বিক্রিতে সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।
ব্যবসায়ীদের উচিত খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণ বা শরীরের গঠন স্পষ্ট করে এমন পোশাকের পরিবর্তে শালীন বোরকার প্রসারে ভূমিকা রাখা। ইসলামের দৃষ্টিতে পর্দার মূল মানদণ্ড হলো পোশাকের শালীনতা, শরীর ঢেকে রাখা এবং ফেতনা থেকে বাঁচা। ডিজাইন করা বোরকা শর্তসাপেক্ষে পরিধান বৈধ এবং এর ব্যবসায় কোনো ধর্মীয় বাধা নেই, যদি তা পর্দার মূল লক্ষ্যকে ব্যাহত না করে। একজন মুমিন নারী নিজের রুচি ও ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি শরিয়তের সীমা লঙ্ঘন না করে পোশাক নির্বাচন করতে পারেন। পোশাক যেন প্রদর্শনের মাধ্যম না হয়ে আত্মরক্ষার ঢাল হয়, এটাই ইসলামি শরিয়তের প্রত্যাশা। সামগ্রিকভাবে, মুসলিম নারীদের পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে আল্লাহভীতি এবং শরিয়তের নির্দেশনার সমন্বয় ঘটালে তা ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে প্রশান্তি বয়ে আনবে।
