হজ ইসলামের অন্যতম মহান ইবাদত এবং জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো এক অনন্য অভিজ্ঞতা। হজের আনুষ্ঠানিকতা কেবল কিছু দৈহিক কসরত নয়, বরং এটি আত্মার পরিশুদ্ধি ও আল্লাহমুখী হওয়ার এক বিশেষ মাধ্যম। একজন হাজি যখন কাবা শরিফের মেহমান হয়ে গুনাহমুক্ত হওয়ার আশা নিয়ে ফিরেন, তখন সবার মনেই একটি প্রশ্ন জাগে যে, তার হজ আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে কি না। হজের কবুলিয়ত আল্লাহর একান্ত ইচ্ছাধীন, তবে কিছু লক্ষণের মাধ্যমে একজন মুমিন হজের প্রভাব ও এর কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বুঝতে পারেন।
প্রথমত, হজের পর একজন হাজীর ঈমান ও আমলের গভীরতা বৃদ্ধি পায়। হজের আগে যে ব্যক্তি ইবাদতে অলসতা করত, হজের পর তার মধ্যে যদি কোরআন তিলাওয়াত ও নফল ইবাদতের প্রতি গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি হয়, তবে তা কবুল হজের অন্যতম আলামত। আল্লাহ তাআলা কোরআনে ঘোষণা করেছেন যে, যারা সৎপথ অবলম্বন করে তিনি তাদের হেদায়েত বৃদ্ধি করে দেন। দ্বিতীয়ত, হজের পর দুনিয়ার মোহ কমে যাওয়া এবং আখিরাতের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়া। হজের ইহরামের কাপড় মানুষকে কাফনের কথা মনে করিয়ে দেয়, তাই একজন হাজি দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে নিজেকে সরিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে ধাবিত করার পরিকল্পনা করেন। তৃতীয়ত, পাপমুক্ত জীবনযাপনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সহিহ বুখারির হাদিসে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি হজ করে এবং অশ্লীলতা ও গুনাহ থেকে দূরে থাকে, সে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে। তাই হজের পর অতীতের সুদ, ঘুষ বা গিবতের মতো গুনাহ থেকে দূরে সরে আসা কবুল হজের অন্যতম শক্তিশালী নিদর্শন। চতুর্থত, নিজের আমলকে তুচ্ছ মনে করা এবং অহংকার না করা। হজের পর কেউ যদি নিজেকে বড় হাজি দাবি না করে বরং নিজের আমলকে আল্লাহর দরবারে অপ্রতুল মনে করে, তবেই তা কবুলিয়তের লক্ষণ। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে, তারা দান বা নেক আমল করার পরও ভীত থাকে যে, শেষ পর্যন্ত কী হবে।
পঞ্চমত, আমল কবুল না হওয়ার ভয় করা। সালাফে সালেহিনরা নেক আমল করার চেয়ে তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে বেশি চিন্তিত থাকতেন। ষষ্ঠত, আশা নিয়ে বেশি বেশি দোয়া করা। ইবরাহিম ও ইসমাইল আ. কাবা নির্মাণের পরও আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন যেন তিনি তা কবুল করেন। সপ্তম এবং অষ্টম লক্ষণ হলো বেশি পরিমাণে ইস্তিগফার করা এবং নেক আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। হজ মানুষকে বিনয়ী করে তোলে এবং সে বুঝতে পারে তার ইবাদতে ঘাটতি রয়েছে, তাই সে ক্ষমা প্রার্থনায় মনোযোগী হয়। নবম আলামত হলো মানুষের হক বা পাওনা আদায়ের ব্যাপারে সচেতন হওয়া। আল্লাহর হক তওবার মাধ্যমে মাফ হলেও বান্দার হক বা পাওনা পরিশোধ ছাড়া মুক্তি নেই। দশম এবং চূড়ান্ত আলামত হলো উত্তম চরিত্র ও নম্রতা অবলম্বন করা। কবুল হজ মানুষের আচার-আচরণে সৌন্দর্য নিয়ে আসে এবং তাকে সব ক্ষেত্রে বিনয়ী ও শান্তিপূর্ণ হতে শেখায়। হজের প্রকৃত সফলতা হাজি উপাধি লাভে নয়, বরং জীবনের পরতে পরতে আল্লাহমুখী হওয়ার মধ্যেই নিহিত।
