কলম্বিয়ার আমাজন বনের আদিবাসী সম্প্রদায় বৃহস্পতিবার সেখানে সাড়ে চার হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী চাগরা পদ্ধতিতে কীটনাশক ছাড়াই সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে কৃষিকাজ পরিচালনা করছেন বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন, বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। আমাজনের গভীর অববাহিকায় জগুয়ারেস দেল ইউরুপারি নামক বিশাল অঞ্চলের প্রায় দুইশত চল্লিশটি আদিবাসী পরিবার তাদের দৈনন্দিন খাদ্যের প্রধান উৎস হিসেবে এই বিশেষ কৃষি ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি ফসলি জমির আয়তন সর্বোচ্চ দুই হেক্টরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয় যাতে বনের স্বাভাবিক পরিবেশের কোনো স্থায়ী ক্ষতি না হয়। প্রথাগত আধুনিক নিবিড় চাষাবাদের বিপরীতে এই ঐতিহ্যবাহী চাগরা পদ্ধতি বনের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্যের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনা করা হয় যা মাটির উর্বরতা দীর্ঘকাল ধরে রাখতে সাহায্য করে।
কলম্বিয়ার সিনচি ইনস্টিটিউটের বিশিষ্ট নৃতাত্ত্বিক এবং সামাজিক-পরিবেশগত বিষয়াবলীর গবেষক হুয়ান ফেলিপ গুহল জানান যে চাগরা পদ্ধতিতে প্রতিটি বীজ বপন এবং ফসল কাটার পেছনে গভীর আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতা কাজ করে। স্থানীয় মিরিতি-পারানা অঞ্চলের আদিবাসী নারী কেলি জোহানা ইয়ুকুনা তার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া এই প্রাচীন জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিজের ছোট জমিতে নিয়মিত চাষাবাদ করেন। তিনি জানান যে নতুন কোনো জমিতে ফসল বোনার আগে সম্প্রদায়ের প্রবীণ ব্যক্তিরা বনের অদৃশ্য প্রাকৃতিক মালিক বা শক্তির কাছে বিনম্র প্রার্থনা করেন যাতে জমিতে কোনো বিষাক্ত সাপ না আসে এবং ফসল যেন প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়। জমি পরিষ্কারের এই আদিম প্রক্রিয়াটিকে স্থানীয় ভাষায় সকোলা ই তুম্বা বলা হয় যেখানে সম্প্রদায়ের সব মানুষ দা ও কুড়াল নিয়ে সম্মিলিতভাবে বনের ছোট গাছপালা পরিষ্কার করেন।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে এই অনন্য চাগরা পদ্ধতিতে ফসলি জমিতে অন্তত অর্ধেক পরিমাণ আদিম বন্য গাছের প্রজাতি সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রাখা হয় যা আধুনিক একমুখী বাণিজ্যিক কাকাও বা কফি বাগানের চেয়ে অনেক বেশি জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে। এই ফসলি জমিগুলো পাঁচ থেকে ছয় বছর ব্যবহার করার পর পুনরায় বনের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয় যাতে প্রকৃতি তার নিজস্ব আদিম রূপ ফিরে পায়। আমাজনের এই প্রাচীন কৃষি ব্যবস্থা কেবল পরিবেশ রক্ষাই করে না বরং এটি সাধারণ বনের সমপরিমাণ কার্বন বাতাসে ধরে রাখতে সক্ষম যা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। যা কম স্পষ্ট তা হলো আধুনিক যুগের ব্যাপক বন উজাড়, মাদক চোরাচালান এবং অবৈধ খনিজ উত্তোলনের আগ্রাসনের মুখে এই আদিম টেকসই জীবনধারা কতদিন তার নিজস্ব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে।
চাগরা চাষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কাসাভা বা স্থানীয় মিষ্টি আলু জাতীয় মূল শস্য যা এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সেখানে প্রায় সাতষট্টি প্রজাতির কাসাভা চাষ করা হয়। আদিবাসী নারীরা এই গাছের সাথে একটি গভীর পারিবারিক ও রক্ত সম্পর্ক অনুভব করেন এবং জমিতে কাসাভার সাথে সবসময় কোকা গাছ রোপণ করা হয়। স্থানীয় সংস্কৃতিতে কাসাভাকে নারীর প্রতীক এবং কোকাকে পুরুষের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয় যার কারণে এই দুটি শস্যকে জমির কেন্দ্রস্থলে সবসময় একসাথে বোনা হয়। গায়া আমাজোনাস নামক একটি আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থার নৃতাত্ত্বিক মার্সিয়া চ্যাপেটন জানান যে তারা এই অঞ্চলে প্রায় একশত চার প্রজাতির বিভিন্ন ওষধি গাছ, ফল, মিষ্টি আলু এবং তামাক চাষের প্রমাণ পেয়েছেন যা ফসলি জমির চারপাশকে এক একটি শক্তিশালী দুর্গের মতো রক্ষা করে।
ভৌগোলিক গবেষক সিজার এচেজুরিয়া ফার্নান্দেজ জানান যে প্রতিবেশী দেশ ইকুয়েডরে এই পদ্ধতিটিকে চাকরাস নামে অভিহিত করা হয় এবং সেখানেও এর পরিবেশগত প্রভাব অত্যন্ত ইতিবাচক। স্থানীয় মায়েরা তাদের সন্তানদের চাগরা জমিতে নিয়ে যান এবং প্রতিটি গাছের উৎপত্তির পেছনের পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক গল্পগুলো শুনিয়ে তাদের নিজেদের সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। বর্তমান ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের এই ক্রান্তিলগ্নে আধুনিক বিশ্বের এই প্রাচীন আদিবাসী জ্ঞান ও টেকসই খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে বলে পরিবেশবাদীরা মনে করেন। এই অনন্য ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে আন্তর্জাতিক স্তরে আমাজন বন রক্ষা এবং আদিবাসীদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা তাদের মত প্রকাশ করেছেন।
