যুক্তরাজ্যের প্রিন্সেস অব ওয়েলস ক্যাথরিন প্রায় চার বছর পর তার প্রথম একক আন্তর্জাতিক সফরে বর্তমানে ইতালিতে অবস্থান করছেন। সফরের দ্বিতীয় দিনে ইতালির উত্তর-মধ্যাঞ্চলীয় শহর রেজ্জো এমিলিয়ার একটি পাহাড়ি আঙুর বাগানে গিয়ে তিনি স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পাস্তা তৈরিতে অংশ নেন। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ক্যাথরিন সেখানে স্থানীয় একটি আউটডোর নার্সারি ও রিসাইক্লিং সেন্টার পরিদর্শন করার পর এই বিশেষ মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেন। ইতালির এই বিশেষ অঞ্চলে এসে তিনি নিজের ইতালীয় ভাষার দক্ষতাও ঝালিয়ে নেন এবং উপস্থিত শিশুদের সঙ্গে চমৎকার সময় কাটিয়েছেন। রাজপরিবারের এই জনপ্রিয় সদস্যের এমন সাধারণ ও প্রাণবন্ত আচরণ স্থানীয় বাসিন্দা ও উপস্থিত আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের মাঝে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
আগ্রিতুরিজমো আল ভিনিয়েতো নামের একটি পাহাড়ি খামারবাড়িতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রিন্সেস ক্যাথরিনকে পাস্তা তৈরির বিভিন্ন কৌশল শেখান পেশাদার শেফ ইভান লামপ্রেদি। প্রিন্সেস নিজের হাতে ময়দা, তেল, লবণ ও জল মিশিয়ে খামির তৈরি করেন এবং পরে একটি মেশিনের সাহায্যে তা পাতলা করে কেটে ঐতিহ্যবাহী ‘তোরতেল্লি’ তৈরি করেন। এই সময় কৌতুক করে তিনি বলেন যে বাড়িতে যখন তিনি পাস্তা তৈরির চেষ্টা করেন তখন বড় পাত্র না থাকায় সব উপাদান চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। পাস্তা তৈরির বেলন ঘোরানোর সময় হঠাৎ এর হাতল খুলে গেলে তিনি বেশ হেসে ওঠেন এবং শেফের কাছে এর সঠিক কৌশল জানতে চান। তার নিখুঁত হাতের কাজ দেখে শেফ লামপ্রেদি রসিকতা করে বলেন যে তিনি প্রিন্সেসকে তাদের রান্নাঘরে কাজের জন্য নিয়োগ দিতে প্রস্তুত।
এই সফরে রাজপরিবারের এই প্রতিনিধির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সংযোগ স্থাপনের গুরুত্ব পর্যবেক্ষণ করা। দিনের শুরুতে প্রিন্সেস ক্যাথরিন সালভাদর আলেন্দে নামের একটি প্রিস্কুল বা প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে যান, যেখানে মূলত উন্মুক্ত পরিবেশে শিশুদের শিক্ষাদানের ওপর জোর দেওয়া হয়। সেখানে শিশুদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন যে বিখ্যাত পরিবেশবিদ ডেভিড অ্যাটেনবরো সব সময় বলেন প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হলে আগে তাকে খুব কাছ থেকে অনুভব করতে হবে। প্রিন্সেস ক্যাথরিন সেখানে তিন থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের সঙ্গে বসে মাটির তৈরি গাছের শিকড়ের মডেল তৈরি করেন এবং তাদের কাছ থেকে কিছু নতুন ইতালীয় শব্দ শেখেন। শিশুদের আন্তরিক ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি নিজেকে ‘ক্যাতেরিনা’ নামে তাদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেন।
মধ্যাহ্নভোজের এই বিশেষ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন রেজ্জো এমিলিয়া পদ্ধতির প্রতিষ্ঠাতা লরিস মালাগুজ্জি কেন্দ্রের কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক। ভোজসভায় পরিবেশন করা হয় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিশেষ পনির, পারমা হ্যাম এবং ঐতিহ্যবাহী লামব্রুস্কো সাদা ওয়াইন। সেখানে উপস্থিত ৮৬ বছর বয়সী কার্লা নিরোনি নামের একজন শিক্ষাবিদ প্রিন্সেসের ভূয়সী প্রশংসা করে মন্তব্য করেন যে ক্যাথরিন রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছেন। তিনি আরও বলেন যে ক্যাথরিন যদি ভবিষ্যতে ব্রিটেনের রানি হন, তবে তিনি হবেন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রানি এবং তার ব্যক্তিত্ব ব্রিটেনের প্রয়াত রানি এলিজাবেথ দ্বিতীয়কে মনে করিয়ে দেয়।
সফর শেষে বিদায় নেওয়ার সময় প্রিন্সেস ক্যাথরিন আধুনিক ডিজিটাল যুগের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে নিজের সংক্ষিপ্ত ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে মানুষ যে প্রকৃতিরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা প্রায়শই ভুলে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। তাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও নিয়মিত প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। এটি আমাদের নিজেদের এমন এক সত্তার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয় যা সাধারণ নাগরিক জীবনে মানুষ সহজে সুযোগ পায় না। বিদায়লগ্নে উপস্থিত শিশু ও প্রবীণরা প্রিন্সেসের সঙ্গে সেলফি তুলতে এবং আলিঙ্গন করতে ভিড় জমান, যা এই সফরের একটি অত্যন্ত মানবিক ও স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে ক্যামেরাবন্দী হয়।
