কাতার ও আরব বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিষ্ঠাতা শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি গত রবিবার ৭৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে পুরো মুসলিম বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি কাতারের সাবেক আমির এবং আধুনিক কাতার রাষ্ট্র গড়ার প্রধান কারিগর হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত ছিলেন। কাতারের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কাতারের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শাসনামলে কাতার বিশ্বের অন্যতম ধনী এবং প্রভাব বিস্তারকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তিনি অত্যন্ত দূরদর্শী ও সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনেন। তাঁর শাসনামলে কাতারের জিডিপি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায় এবং দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তরিত হয়।
১৯৯৬ সালে তিনি আল জাজিরা সংবাদ মাধ্যম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আরব বিশ্বের গণমাধ্যমে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। আল জাজিরা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল আরব বিশ্বের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা এবং সাংবাদিকতার মানদণ্ডে এক নতুন ধারা তৈরি করা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি এই গণমাধ্যমটিকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রাখার ক্ষেত্রে অবিচল ছিলেন। আজকের দিনে আল জাজিরা যে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে, তার মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন তিনি।
তিনি ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের পক্ষে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা অবরোধের সময় প্রথম আরব নেতা হিসেবে তিনি সেখানে গিয়ে সংহতি প্রকাশ করেছিলেন। তিনি শিক্ষা ও গবেষণার প্রসারে কাতার ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন যা এখন বিশ্বজুড়ে শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে সমাদৃত। তাঁর শাসনামলে কাতারে বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, যার মধ্যে রয়েছে আধুনিক বিমানবন্দর ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রসমূহ।
২০১৩ সালে তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়িয়ে তাঁর ছেলে বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। আরব বিশ্বে সাধারণত ক্ষমতার রদবদল যেভাবে হয়, তার চেয়ে এটি ছিল একেবারেই ব্যতিক্রম এবং অত্যন্ত বিরল একটি উদাহরণ। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্বনেতারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং কাতারের আধুনিকায়নে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করেছেন। তিনি কাতারের এক অসামান্য অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটালেন, তবে তাঁর রেখে যাওয়া উন্নয়ন ও সংস্কারের পথ আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
