বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩

গাজার বেসামরিক কর্মকর্তাদের হত্যা: শান্তি প্রক্রিয়া বানচালের কৌশল

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম

গাজার বেসামরিক কর্মকর্তাদের হত্যা: শান্তি প্রক্রিয়া বানচালের কৌশল

Ai - Photo

গাজা উপত্যকার উত্তরাঞ্চলের জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলায় পুলিশ স্টেশনের পরিচালকসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলাটি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি গাজার বেসামরিক প্রশাসন ও সমাজ কাঠামোকে ধ্বংস করার এক পরিকল্পিত কৌশলের অংশ। মাসের পর মাস চলা যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ইসরায়েলি বাহিনী ধারাবাহিকভাবে গাজার আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, চিকিৎসা কর্মী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত যুদ্ধপরবর্তী গাজা পুনর্গঠন পরিকল্পনা নস্যাৎ করা এবং এলাকাটিতে স্থায়ী দখলদারিত্ব বজায় রাখা।

ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির শর্তাবলী মেনে চলার পরিবর্তে প্রতিদিন গাজায় সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। আল জাজিরার তথ্যমতে, সাতই অক্টোবর ২০২৩ থেকে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭৩,২৩৩ জনে পৌঁছেছে এবং আহত হয়েছেন ১,৭৩,৭০৭ জন। যুদ্ধবিরতির ২৭৫ দিনে ইসরায়েলের ৩,৬৮৯টি লঙ্ঘনের ঘটনা রেকর্ড করেছে গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস, যাতে ১,১২২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইসরায়েল প্রত্যাশিত সাহায্যবাহী ট্রাকের মাত্র ৩৫ শতাংশ এবং ভ্রমণকারীদের ৩৬ শতাংশকে সীমান্তে প্রবেশ করতে দিচ্ছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয় জানিয়েছে যে, ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে পুলিশ কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করছে, যারা গাজায় নাগরিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে অন্তত ১২টি হামলায় ৩৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি গাজার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। গাজার অধিকাংশ হাসপাতাল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বোমা হামলায় মাটির সাথে মিশে গেছে। ফিলিস্তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৪৪১ জন শিক্ষক এবং ১১,০০০-এর বেশি শিক্ষার্থী এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন।

গাজার বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকেও পরিকল্পিতভাবে নির্মূল করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ১১৭ জন শিক্ষাবিদকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজার প্রেসিডেন্ট এবং বিশিষ্ট গণিতবিদ সুফিয়ান তায়েহ উল্লেখযোগ্য, যিনি জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে নিজের পরিবারের সাথে নিহত হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ আল-তানানি মনে করেন, ইসরায়েলের উদ্দেশ্য এখন কেবল নিরাপত্তা ইস্যু নয়, বরং গাজার সামগ্রিক জাতীয় কাঠামো এবং সামাজিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। গাজার প্রশাসনিক কমিটি ভেঙে দেওয়ার মাধ্যমে হামাস রাজনৈতিক নমনীয়তা দেখালেও ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধে কোনো আগ্রহী নয়।

গাজা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মোহান্নাদ মোস্তফা জানান, ইসরায়েল তিনটি কৌশলে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছে। প্রথমত, যুদ্ধবিরতির আড়ালে নিয়মিত হামলা চালিয়ে পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করে তোলা। দ্বিতীয়ত, দখলদারিত্বের এলাকা বাড়িয়ে গাজার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং অবকাঠামো ধ্বংস করা। তৃতীয়ত, ফিলিস্তিনি জাতীয় কমিটির প্রবেশাধিকার আটকে দেওয়া এবং মানবিক ত্রাণ সরবরাহ বন্ধ রাখা। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাৎজ সম্প্রতি গাজা ধ্বংসের নীতিকে সমর্থন জানিয়েছেন, যা থেকে স্পষ্ট যে গাজাকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলাই তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।

গ্লোবাল পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট পাওলো ভন শিরাক মনে করেন, এই ধ্বংসযজ্ঞ কেবল হামাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গাজাকে বসবাসের অযোগ্য করে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করাই এর আসল উদ্দেশ্য। এই পরিস্থিতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনা বা বোর্ড অব পিস সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। কোনো নিরাপত্তা বাহিনী বা প্রশাসন ছাড়াই গাজাকে এক অমানবিক অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে, যেখানে কূটনীতিকদের ব্যর্থতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

banner
Link copied!