বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

তিন দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কাঠামো ঘোষণা করল আঙ্কারা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ১৩, ২০২৬, ০৮:০৫ পিএম

তিন দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কাঠামো ঘোষণা করল আঙ্কারা

তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তান গত সাতই আগস্ট সই হওয়া পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা ও কার্যপদ্ধতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে বলে আঙ্কারার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে জানানো হয় যে এই সামরিক চুক্তির মূল লক্ষ্য দুই দেশের মধ্যাকার সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় এবং দীর্ঘস্থায়ী করা। গত সপ্তাহে পবিত্র মক্কা নগরীতে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে স্বাক্ষরিত এই মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী তিন দেশের শীর্ষ মন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের নিয়ে বিশেষ উচ্চপর্যায়ের যৌথ প্রক্রিয়া গড়ে তোলা হবে। আনাদোলু এবং রয়টার্স জানিয়েছে যে এই ত্রিমুখী সামরিক সমঝোতা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ পুরো জোটের ওপর আক্রমণ বলে গণ্য হবে, যা মূলত পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা ধারার সাথে তুলনীয়। আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনে তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিস্তারিত তুলে ধরে জানায় যে চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তিন দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের সমন্বয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কৌশলগত রাজনৈতিক ও সামরিক প্রক্রিয়া গঠিত হবে। এর মাধ্যমে তিন দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা, যৌথ মহড়া এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারিত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তনের মুখে এই চুক্তি পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রকে বহুলাংশে প্রশস্ত করবে।

বিশ্লেষকদের মতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পশ্চিমা নিরাপত্তার ওপর নির্ভরতা হ্রাসের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে এর আগে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই এই নতুন ত্রিমুখী ত্রিপক্ষীয় চুক্তি গড়ে উঠেছে। বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে এবং সামরিক উৎপাদনে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করতে এই তিন দেশের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে আসছিলেন। চুক্তির অধীনে যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তি বিনিময়ের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।

তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এর আগে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন যে এই জোটটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়। বরং আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সন্ত্রাস দমনের যৌথ প্রতিশ্রুতি থেকেই এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সাথে চুক্তির পরিধি এবং শর্তগুলোর বিষয়ে তিন দেশের পক্ষ থেকে সমান্তরালভাবে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে যাতে আঞ্চলিক কূটনীতিতে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ না থাকে। সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে তুর্কি প্রশাসনের যৌথ প্রচেষ্টায় এই নিরাপত্তা স্থাপত্য গড়ে উঠেছে।

ভবিষ্যতে এই জোটে সমমাতা অন্যান্য দেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও খোলা রাখা হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে তুরস্কের আধুনিক ড্রোন ও সমরাস্ত্র উৎপাদন এবং পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সামরিক অভিজ্ঞতা এই চুক্তির কার্যকারিতাকে আরও শক্তিশালী করবে। সামনের দিনগুলোতে নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়া এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে এই অংশীদারিত্বকে মাঠপর্যায়ে কার্যকর করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এই ঐতিহাসিক চুক্তির ফলে তিন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে আন্তঃকার্যকারিতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের পারস্পরিক সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। সামরিক সরঞ্জামের মানসম্মত সমন্বয় এবং যৌথ হুমকির মূল্যায়নের জন্য একটি স্থায়ী সচিবালয় বা সমন্বয় সেল গঠনের কাজও এগিয়ে চলছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে এবং এর বাইরেও দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই অংশীদারিত্ব অত্যন্ত ফলপ্রসূ হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে এই চুক্তি কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং আত্মনির্ভরশীল একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর বাস্তবায়ন। যা কম স্পষ্ট তা হলো এই ত্রিমুখী সামরিক বন্দোবস্ত আঞ্চলিক শক্তিসাম্য রক্ষায় কতটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে, তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে একে একটি নতুন কৌশলগত অক্ষ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকরা। আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই তিন দেশের সম্মিলিত উদ্যোগ সামনের দিনে বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

banner
Link copied!