শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬, ২৬ বৈশাখ ১৪৩৩

ইয়েমেনি সেনাদের জীবনসংকট: বেতনহীন মাসের পর মাস

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৯, ২০২৬, ০১:২৭ পিএম

ইয়েমেনি সেনাদের জীবনসংকট: বেতনহীন মাসের পর মাস

ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর মারিবের উপকণ্ঠে একটি সাধারণ সামরিক কক্ষে বসে আছেন সুলাইমান আল-হাজ। সঙ্গে তার আরও দুই সহযোদ্ধা। রণক্ষেত্রের উত্তাপের চেয়েও এখন তাদের বেশি ভাবিয়ে তুলছে পরিবারের ভবিষ্যৎ। সুলাইমান বারবার তার ফোনে বার্তা পাঠাচ্ছেন এবং পরিচিতদের কল করছেন—যদি কোথাও থেকে কিছু ঋণ পাওয়া যায়। কারণ, সেনাবাহিনীর নিয়মিত বেতন না আসায় তার সংসার এখন অচল। এটি কেবল সুলাইমানের একার গল্প নয়, বরং ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের হয়ে লড়াই করা হাজার হাজার সেনার প্রাত্যহিক বাস্তবতা।

ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর একজন সদস্য মাসে গড়ে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার ইয়েমেনি রিয়াল বেতন পান। মার্কিন ডলারে যার পরিমাণ মাত্র ৩৮ থেকে ১১৬ ডলার। বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির বাজারে এই সামান্য অর্থ দিয়ে একটি পরিবারের নূন্যতম ভরণপোষণ চালানোও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের নিয়মিত সেনাবাহিনীতে সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার। তবে এর মধ্যে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সেনা সরাসরি সম্মুখ সমরে নিযুক্ত রয়েছেন। বাকিরা লজিস্টিক সাপোর্ট বা পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত।

সেনাবাহিনীর জন্য সরকারের মাসিক বাজেট প্রায় ৩৬ বিলিয়ন রিয়াল বা ২৩.২ মিলিয়ন ডলার। এর একটি বড় অংশ বরাদ্দ থাকে এডেন ভিত্তিক চতুর্থ সামরিক অঞ্চলের জন্য। তবে বাজেটের এই পরিসংখ্যান কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে সেনাদের হাতে বেতন পৌঁছাতে মাসের পর মাস দেরি হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তার অধীনে থাকা সেনারা সর্বশেষ বেতন পেয়েছেন গত বছরের ডিসেম্বরে। যদিও সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে মে মাসের শেষ দিকে ঈদুল আজহার আগে সব বকেয়া পরিশোধ করা হবে, কিন্তু সেই নিশ্চয়তা এখনো মেলেনি।

২০১৪ সাল থেকে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে ইয়েমেন সরকার। রাজধানী সানা হারানোর পর এডেনকে অন্তর্বর্তীকালীন রাজধানী করা হলেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো সম্ভব হয়নি। দুই পক্ষই একে অপরের আয়ের উৎসগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করায় তারল্য সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। এর ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থমকে গেছে, অন্যদিকে সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্বে থাকা সেনারাও এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

অবাক করার মতো বিষয় হলো, নিয়মিত সেনাবাহিনীর বাইরে সরকারের অধীনে থাকা অন্যান্য সশস্ত্র ইউনিটগুলোর অবস্থা বেশ ভিন্ন। সিকিউরিটি বেল্ট, জায়ান্টস ব্রিগেড বা ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্সের মতো ইউনিটগুলোর সেনারা নিয়মিত বেতন পান এবং তাদের মাসিক বেতন প্রায় ৩২০ ডলার পর্যন্ত। আল জাজিরার বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈষম্য নিয়মিত সেনাবাহিনীর জন্য এক বড় বিপদ। বেতন না পেয়ে অভিজ্ঞ অনেক সেনা নিয়মিত বাহিনী ছেড়ে এই অনিয়মিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোতে যোগ দিতে পারেন, যা জাতীয় সামরিক কাঠামোকে দুর্বল করে তুলবে।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আল-জামায়ি মনে করেন, বেতনের এই দীর্ঘসূত্রতা কেবল সেনাদের ব্যক্তিগত সংকট নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ক্ষুধার্ত সেনা সম্মুখ সমরে কতটা একাগ্র হতে পারবেন, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মারিব বা এডেনের মতো শহরগুলোর ছোট ব্যবসায়ীরা মূলত সেনাদের কেনাকাটার ওপর নির্ভর করেন। সেনাদের পকেটে টাকা না থাকায় স্থানীয় অর্থনীতিও স্থবির হয়ে পড়েছে। ইয়েমেনের এই যোদ্ধারা এখন কেবল হুথিদের বিরুদ্ধেই লড়ছেন না, তাদের লড়াই করতে হচ্ছে নিজ দেশের চরম দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধেও।

banner
Link copied!