বুধবার, ০৩ জুন, ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বরফ গলছে যুক্তরাজ্য-চীন সম্পর্কে, বেইজিং সফরে ইভেট কুপার

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ৩, ২০২৬, ০৩:৪৭ পিএম

বরফ গলছে যুক্তরাজ্য-চীন সম্পর্কে, বেইজিং সফরে ইভেট কুপার

যুক্তরাজ্য ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের শীতল কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ আনুষ্ঠানিকভাবে গলতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বর্তমানে তিন দিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিংয়ে অবস্থান করছেন, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের একটি বড় প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত মঙ্গলবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান জেংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন কুপার। বৈঠকে তিনি বৈশ্বিক নানা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ যৌথভাবে মোকাবিলা করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।লন্ডন ও বেইজিংয়ের এই নতুন মোড়কে কূটনৈতিক বরফ গলন হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।

এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার নিজেই বেইজিং সফর করেছিলেন। সেই উচ্চপর্যায়ের সফরে ব্রিটিশ ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনকার ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ চুক্তি এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য চীন ভ্রমণের ক্ষেত্রে অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সম্পন্ন হয়। কুপারের বর্তমান সফরটি মূলত প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের সেই কূটনৈতিক উদ্যোগেরই একটি প্রত্যক্ষ ধারাবাহিকতা। 

এর আগে ২০১৮ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট এভাবে পর পর চীন সফর করেছিলেন, যার আট বছর পর আবার একই ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা গেল। কুপার তার এই সফরে ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরানের আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোয় ইবোলা প্রাদুর্ভাবের মতো জটিল বৈশ্বিক সংকট নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্পষ্টভাষিতার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক মতপার্থক্য দূর করার আহ্বান জানান।

তবে এই আকস্মিক সফরের পেছনে পশ্চিমাদের গভীর বাণিজ্যিক ও কৌশলগত কাঠামোগত নির্ভরতার বিষয়টিকে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত চিকিৎসাসামগ্রী এবং মহাকাশ গবেষণার বিভিন্ন জটিল উপাদান তৈরির জন্য বৈশ্বিক পরাশক্তি চীনের ওপর পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক নির্ভরতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির উদ্ভাবনে চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে। গত বছর দুই দেশের মধ্যে একটি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার ধারাবাহিকতায় যুক্তরাজ্যের বৃহত্তম বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অক্টোপাস এনার্জি চীনের পিসিজির সঙ্গে একটি বড় যৌথ উদ্যোগ শুরু করেছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনাকাঙ্ক্ষিত ও একমুখী বাণিজ্যিক নীতিও লন্ডনকে বেইজিংয়ের কাছাকাছি আসতে এক প্রকার বাধ্য করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান সংঘাতে মার্কিন বাহিনীকে সরাসরি সামরিক সহায়তা না দেওয়া এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করতে নৌবাহিনীর ব্যাকআপ পাঠাতে কিয়ার স্টারমারের অস্বীকৃতির কারণে ওয়াশিংটন ও লন্ডনের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি ট্রাম্পের ইউরোপীয় ইউনিয়ন-বিরোধী অবস্থান এবং ন্যাটো জোটকে অকার্যকর বলার প্রবণতা ব্রিটিশ সরকারকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। একই সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে সৃষ্ট জ্বালানির উচ্চমূল্যের ধাক্কা এবং যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দা দূর করতে বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা এখন লন্ডনের জন্য অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি পদক্ষেপ।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জার্মানির মতো ইউরোপীয় দেশগুলো যেখানে উচ্চ-প্রযুক্তির ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে চীনের সঙ্গে সরাসরি কঠিন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, সেখানে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাজ্য মূলত উচ্চ-মূল্যের আর্থিক এবং অন্যান্য profesisonal সেবা খাতে অত্যন্ত শক্তিশালী, যেখানে চীনের অবস্থান তুলনামূলকভাবে কিছুটা দুর্বল। ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক শক্তি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে, যা পারস্পরিক বাণিজ্যের পথকে আরও সহজ করে তোলে। সফরসূচি অনুযায়ী, ইভেট কুপার বেইজিংয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে চীনের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি হাব শেনঝেন সফর করবেন, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

banner
Link copied!