শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

লাওসে পর্যটকদের মৃত্যু: সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পায়নি দেশটির police

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ১৮, ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম

লাওসে পর্যটকদের মৃত্যু: সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পায়নি দেশটির police

ছবি : সংগৃহীত

লাওসের জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয় শনিবার ভিয়েনতিয়েন থেকে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে ২০২৪ সালে সংঘটিত লাওসে পর্যটকদের মৃত্যু-র প্রকৃত কারণ বা এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি, এএফপি জানিয়েছে। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্ত করার অনুমতি না দেওয়ায় এই মৃত্যুর পেছনে মেথানলযুক্ত বিষাক্ত মদ্যপানের ভূমিকা ছিল কি না তা আইনগতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হচ্ছে না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির বিখ্যাত নদীর তীরবর্তী পর্যটন শহর ভ্যাং ভিয়েং-এ মদ্যপানের পর ওই আসরের নভেম্বর মাসে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক এবং আমেরিকার ছয়জন ব্যাকপ্যাকার বা পর্যটক মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিলেন। এই বেদনাদায়ক ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্ট্রেলিয়া ও ডেনমার্ক সহ ভুক্তভোগী দেশগুলোর সাথে লাওস প্রশাসনের এক তীব্র কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপানউতোর তৈরি হয়েছে।

লাওসের জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয় তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে যে ফরেনসিক বা চিকিৎসা সংক্রান্ত অকাট্য প্রমাণের অভাবেই তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ গঠন করতে পারছে না। তবে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য ও ওষুধ গবেষণা কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত টাইগার ভদকা নামক ব্র্যান্ডের মদে মাত্রাতিরিক্ত ও মারাত্মক মেথানলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অস্ট্রেলিয়ান দূতাবাস এবং থাইল্যান্ডের একটি হাসপাতালের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মৃত দুই অস্ট্রেলীয় তরুণীর রক্তেও বিষাক্ত মেথানল শনাক্ত করা হয়েছিল। এই প্রাথমিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় টাইগার ডিস্টিলারি বা মদ উৎপাদন কারখানার মালিকের বিরুদ্ধে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্য তৈরি এবং অবৈধ ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নিশ্চিত করেছে যে গত শুক্রবার এই মদ কারখানার মালিকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

এই আইনি পদক্ষেপের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এক বিবৃতিতে গভীর ক্ষোভ ও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ক্যানবেরায় নিযুক্ত লাওসের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে অস্ট্রেলিয়া সরকার জানিয়েছে যে এই মর্মান্তিক ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দেওয়ায় তারা চরমভাবে হতাশ হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া প্রশাসন শুরু থেকেই এই ঘটনার একটি স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে আসছিল এবং তাদের ফেডারেল পুলিশ এই তদন্তে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করলেও লাওস সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরাও এই সামান্য আইনি সাজার বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন যে তাদের সন্তানদের জীবনের কোনো সঠিক মূল্যই দেওয়া হয়নি। লাওসের বর্তমান বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতার অভাবের কারণে এই ধরনের অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

যা কম স্পষ্ট তা হলো এই সামান্য শাস্তির পর আগামী দিনগুলোতে লাওসের আন্তর্জাতিক পর্যটন ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব ঠিক কতটা গভীর হবে। ভ্যাং ভিয়েং শহরটি দীর্ঘ সময় ধরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভ্রমণকারী তরুণ পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এই বিষক্রিয়ার ঘটনার পর এটি একটি বড় ধাক্কা খেয়েছে। অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডা সরকার তাদের নাগরিকদের লাওস ভ্রমণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার এবং স্থানীয় ব্র্যান্ডের খোলা মদ বা ককটেল পান করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে। বিষাক্ত মেথানল সাধারণত সস্তা রঙের পাতলা করার রাসায়নিক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার আশায় এটি মদের সাথে মিশ্রিত করে থাকে যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক ও প্রাণঘাতী হতে পারে।

মৃত পর্যটকদের মধ্যে ছিলেন উনত্রিশ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক সিমোন হোয়াইট, উনিশ বছর বয়সী দুই অস্ট্রেলীয় তরুণী বিয়াঙ্কা জোন্স ও হোলি মোর্টন বোয়েলস, ডেনমার্কের দুই নাগরিক অ্যান সোফি এবং ফ্রেজা ভেনেরভাল্ড এবং সাতান্ন বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক জেমস লুইস হাটসন। এই পর্যটকদের অনেকেই ভ্যাং ভিয়েং-এর নানা ব্যাকপ্যাকার হোস্টেলে অবস্থান করছিলেন যেখানে তাদের বিনামূল্যে মদ্যপানের অফার দেওয়া হয়েছিল। গত জানুয়ারি মাসে ওই হোস্টেলের মালিক এবং দশজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে মৃত্যুর পর তথ্য ও প্রমাণ ধ্বংস করার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছিল এবং তাদের সাময়িক কারাদণ্ড ও নির্দিষ্ট জরিমানা করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর যুক্তরাজ্য সরকার তাদের দেশের পর্যটকদের বিদেশে ভ্রমণের সময় মেথানল বিষক্রিয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন করতে একটি নতুন আন্তর্জাতিক প্রচারণা শুরু করেছে।

banner
Link copied!