হলিউড তারকা ব্র্যাড পিট ও অ্যাঞ্জেলিনা জোলির সন্তানরা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের বাবার পদবি বর্জন করার চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া থেকে বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। জোলি ও পিটের দত্তক নেওয়া দুই সন্তান ২১ বছর বয়সী জহিরা মার্লে এবং ২৪ বছর বয়সী ম্যাডক্স চিভান গত এপ্রিল মাসে তাদের নাম থেকে বাবার পদবি স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়ার জন্য আদালতে আনুষ্ঠানিক আবেদনপত্র জমা দেন। ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় আইনি নিয়ম অনুযায়ী তারা গত জুন ও জুলাই মাসে টানা চার সপ্তাহ ধরে স্থানীয় সংবাদপত্রে তাদের নাম পরিবর্তনের এই আইনি অভিপ্রায় নোটিশ আকারে প্রকাশ করেছেন। এর আগে ২০২৪ সালে তাদের আরেক সন্তান শাইলোও আনুষ্ঠানিকভাবে জোলি পদবি গ্রহণ করার মাধ্যমে বাবার নাম বর্জন করেছিলেন যা সেসময় বেশ আলোড়ন তৈরি করে।
পারিবারিক আদালতের নিয়ম অনুযায়ী আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জহিরা এবং ম্যাডক্স বিচারকের সামনে উপস্থিত হয়ে তাদের এই নাম পরিবর্তনের চূড়ান্ত আইনি অনুমোদন লাভ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই তারকা দম্পতির ২০১৬ সালের বিচ্ছেদের পর থেকে সন্তানদের সাথে বাবার এক গভীর মানসিক দূরত্ব তৈরি হয় যা এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ২০২০ সালে জোলি ভোগ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে তিনি তাঁর পরিবারের মঙ্গলের জন্যই পিটের কাছ থেকে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ব্র্যাড পিটের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে যে পরিবারের সাথে এমন দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঘটনায় অভিনেতা অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন তবে তিনি তাঁর সন্তানদের এই স্বাধীন সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সম্মান জানান।
কেবলমাত্র এই হলিউড তারকার পরিবারই নয় বরং বর্তমান সময়ে সাধারণ অনেক তরুণও একই কারণে তাদের বাবার পদবি বর্জন করার পথ বেছে নিচ্ছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার ২৫ বছর বয়সী হান্না নামের এক তরুণী সম্প্রতি তাঁর বাবার পদবি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে মায়ের কুমারী নাম এবং স্বামীর পদবি যুক্ত করে নতুন নাম ধারণ করেছেন। হান্না জানিয়েছেন যে শৈশবে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর থেকে বাবার সাথে তাঁর কোনো কার্যকর যোগাযোগ ছিল না এবং এই নাম পরিবর্তনের জন্য তাঁকে প্রায় চারশত মার্কিন ডলার আদালতের ফি এবং একশত ত্রিশ মার্কিন ডলার পত্রিকার বিজ্ঞাপন বাবদ খরচ করতে হয়েছে। যুক্তরাজ্যের লিংকনশায়ারের ম্যাগি নামের আরেক তরুণীও ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন যাতে বাবার অনুমতি ছাড়াই তিনি তাঁর মায়ের পরিবারের পদবি আইনিভাবে গ্রহণ করতে পারেন কারণ তাঁর বাবার পদবিটির কারণে স্কুলে তাঁকে নিয়মিত উপহাসের শিকার হতে হতো।
পারিবারিক কাউন্সেলর ও গবেষকদের মতে যেসব সন্তান তাদের পরিবারের কোনো সদস্যের কাছ থেকে মানসিকভাবে দূরে সরে যান বা অতীতে কোনো বড় মানসিক আঘাতের মুখোমুখি হন তারা নিজেদের সুরক্ষার অংশ হিসেবে এই ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ক্ষতিকারক বা বেদনাদায়ক কোনো স্মৃতি বহনকারী পদবি বারবার উচ্চারণ করা এড়াতে এই পরিবর্তনটি তাদের মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি ও স্বাধীনতা প্রদান করে। কিছু সমালোচক মনে করেন যে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম কোনো গভীর চিন্তা ছাড়াই পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছে তবে আধুনিক সামাজিক গবেষণা এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত যত্ন ও গভীর বিবেচনার পরেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তাঁর পরিবারের সাথে আইনি সম্পর্ক বা নাম পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে নাম পরিবর্তনের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে দুটি আইনি বিকল্প পথ রয়েছে যার মধ্যে একটি হলো খুব কম খরচে ব্যক্তিগতভাবে এবং অন্যটি হলো উচ্চ আদালতের মাধ্যমে মাত্র ৫৩ দশমিক ০৫ পাউন্ড বা প্রায় ৭১ মার্কিন ডলার ব্যয়ে সরকারি নথিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করা। স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডেও নির্দিষ্ট ফি প্রদানের মাধ্যমে এই নাম পরিবর্তনের আইনি সুযোগ রয়েছে তবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে পিতা-মাতা উভয়ের আইনি সম্মতি থাকা বাধ্যতামূলক। যা কম স্পষ্ট তা হলো এই ধরনের নাম পরিবর্তনের হার বিগত বছরগুলোর তুলনায় বিশ্বব্যাপী ঠিক কত শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এটি ভবিষ্যৎ পারিবারিক কাঠামোর ওপর কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব ফেলবে। নাম পরিবর্তনের এই জটিল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর নাগরিকদের তাদের পাসপোর্ট অফিস, ড্রাইভিং লাইসেন্স কর্তৃপক্ষ, ব্যাংক এবং চিকিৎসাকেন্দ্র সহ সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তাদের নতুন পরিচয় হালনাগাদ করতে হয় যা বেশ সময়সাপেক্ষ একটি কাজ।
