রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

অবৈধ ইসরায়েলি বসতির পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করল বেলজিয়াম

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ১৮, ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম

অবৈধ ইসরায়েলি বসতির পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করল বেলজিয়াম

বেলজিয়ামের ফেডারেল সরকার শনিবার অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুমোদন দিয়েছে বলে ব্রাসেলস থেকে আল জাজিরা এবং আনাদোলু এজেন্সি নিশ্চিত করেছে। গ্রীষ্মকালীন ছুটির আগে অনুষ্ঠিত সরকারের শেষ মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয় বলে বেলজিয়ান নিউজ এজেন্সি বেলগা প্রকাশ করেছে। ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক আগ্রাসন এবং সেখানে ব্যাপক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির প্রতিক্রিয়ায় গত বছরের শেষের দিকে বেলজিয়াম সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এটি তারই বাস্তবায়ন। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বেলজিয়াম ইউরোপের সেই ছোট কিন্তু দ্রুত বর্ধনশীল দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হলো যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করে নিজস্ব উদ্যোগে ইসরায়েলের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যখন অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের অবৈধ বসতিগুলোর সাথে বাণিজ্য বন্ধের বিষয়ে একটি যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছেন তখনই বেলজিয়াম এই স্বাধীন পদক্ষেপ গ্রহণ করল। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাক্সিম প্রেভোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য তীব্র চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি সেসময় ইউরোপীয় কমিশনকে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা দেওয়ার পরিবর্তে কেবল প্রতীকী কিছু বিকল্প নিয়ে সময়ক্ষেপণ করার জন্য তীব্র সমালোচনা করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস এবং স্পেন এই পণ্য আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে থাকলেও জার্মানি ও ইতালির মতো দেশগুলো এর তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। এই বিভক্তি মূলত ইউরোপীয় নীতিমালার গভীর ফাটলকে স্পষ্ট করে যেখানে কিছু দেশ বাণিজ্যিক স্বার্থকে মানবাধিকারের ওপরে স্থান দিচ্ছে।

এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য দ্বন্দ্বের পটভূমিতে ইউরোপীয় কমিশন সম্প্রতি সদস্য দেশগুলোর কাছে তিনটি সম্ভাব্য বিকল্প প্রস্তাবের একটি খসড়া বিতরণ করেছে যার মধ্যে রয়েছে কঠোর রপ্তানি লাইসেন্স ব্যবস্থা, উচ্চ শুল্ক আরোপ এবং আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা। তবে এই বিকল্পগুলো এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো আইনগত প্রস্তাবে রূপান্তরিত না হওয়ায় জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এদিকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের গতি সাম্প্রতিক সময়ে নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ফিলিস্তিনের স্থানীয় প্রতিরোধ কমিটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি জুলাই মাসের শুরু থেকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব ভূমির ওপর এক হাজার চব্বিশটি নতুন বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপ মূলত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে স্থায়ীভাবে দখল করার একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্ত।

ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান এই আগ্রাসনকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রধান অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করছে। জাতিসংঘ বারবার পুনর্ব্যক্ত করেছে যে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের যেকোনো ধরনের বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী এবং এটি দুই রাষ্ট্র ভিত্তিক স্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনাকে চিরতরে নস্যাৎ করছে। দুই হাজার চব্বিশ সালে আন্তর্জাতিক আদালত কর্তৃক প্রদত্ত একটি ঐতিহাসিক পরামর্শমূলক রায়েও স্পষ্ট বলা হয়েছিল যে রাষ্ট্রগুলোর উচিত এমন যেকোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এড়িয়ে চলা যা এই ধরনের অবৈধ আঞ্চলিক দখলদারিত্বকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। বেলজিয়ামের এই নতুন সিদ্ধান্তটি মূলত সেই আন্তর্জাতিক নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতার সাথে তাদের জাতীয় বাণিজ্য নীতিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি বাস্তব প্রয়াস।

যা কম স্পষ্ট তা হলো এই নতুন আমদানির নিষেধাজ্ঞাটি ঠিক কবে থেকে সম্পূর্ণ কার্যকর হবে এবং এটি কোন কোন সুনির্দিষ্ট বাণিজ্যিক খাতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। বেলজিয়ামের স্থানীয় গণমাধ্যম লে সোয়ার জানিয়েছে যে এই নিষেধাজ্ঞার আইনি কাঠামো এবং বাস্তবায়নের বিশদ প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত করা বাকি রয়েছে। দুই হাজার তেইশ সালের অক্টোবর মাস থেকে শুরু হওয়া গাজায় ইসরায়েলের এই রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত তিয়াত্তর হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং এক লাখ তিয়াত্তর হাজারেরও বেশি মানুষ গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে ইউরোপের সাধারণ জনগণের মধ্যেও ইসরায়েলের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য স্ব-স্ব সরকারের ওপর তীব্র গণচাপ তৈরি হয়েছে। ব্রাসেলসের রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে ইসরায়েলের সাথে সমস্ত চুক্তি বাতিলের জোরালো দাবি জানিয়েছেন।

এই তীব্র ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বেলজিয়ামের এই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিজস্ব আইনি ও কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলি বসতিগুলোকে অবৈধ বলে ঘোষণা করার পরেও বাণিজ্য সচল রাখে তবে তা তাদের নিজস্ব আইন ও মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করবে। বেলজিয়াম এই নিষ্ক্রিয়তার সংস্কৃতিকে挑戰 করে প্রমাণ করেছে যে মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে তারা আর কোনো রাজনৈতিক আপস করতে রাজি নয়। এই সাহসী পদক্ষেপটি আগামী দিনে ইউরোপের অন্যান্য দেশকেও অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং এর ফলে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনের পক্ষে বৈশ্বিক সমর্থন আরও সুদৃঢ় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

banner
Link copied!