বুধবার, ০৩ জুন, ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

যুক্তরাজ্যে ডানপন্থী ভোটের বিভাজন: ফারাজের রাজত্বে ফাটল?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ৩, ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম

যুক্তরাজ্যে ডানপন্থী ভোটের বিভাজন: ফারাজের রাজত্বে ফাটল?

ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যের ডানপন্থী ও অভিবাসনবিরোধী রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ দেখা দিয়েছে, যেখানে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে দলের একচ্ছত্র আধিপত্য এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দলটির সাবেক প্রভাবশালী নেতা এবং গ্রেট ইয়ারমাউথের সংসদ সদস্য রুপার্ট লো-র নেতৃত্বে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল ‘রিস্টোর ব্রিটেন’ মাত্র চার মাসের মধ্যে ব্যাপক জনসমর্থন পেয়ে ফারাজের ভোটব্যাংকে বড় ফাটল ধরাতে শুরু করেছে। এই রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই চলতি মাসের ১৮ জুন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেকারফিল্ড আসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপ-নির্বাচন, যা দেশের সামগ্রিক রাজনীতি ও লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের লড়াই নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।ডানপন্থী দলগুলোর এই বিভাজন মূলত মেকারফিল্ডের নির্বাচনী সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে।

নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে চলতি সপ্তাহে নাইজেল ফারাজ একটি উন্মুক্ত মাঠে দাঁড়িয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশের আহ্বান জানান। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে সাউদাম্পটনে ১৮ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ-পোলিশ তরুণ হেনরি নোয়াককে এক শিখ যুবক কৃপাণ দিয়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে হত্যাকারী ভিক্রম দিগওয়া নিজেকে নির্দোষ দাবি করে নোয়াকের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী আচরণের মিথ্যা অভিযোগ তোলে, যার ফলে পুলিশ মুমূর্ষু নোয়াককে হাসপাতালে নেওয়ার বদলে হাতকড়া পরায়। বডি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে তরুণটি বারবার বলছিল যে সে শ্বাস নিতে পারছে না। এই নির্মম ঘটনাটিকে ফারাজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডের সাথে তুলনা করে শ্বেতাঙ্গদের প্রতি চরম বৈষম্য ও দুই স্তরের police ব্যবস্থার উদাহরণ হিসেবে সামনে এনেছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফারাজের এই আবেগঘন প্রচারণার আসল উদ্দেশ্য হলো তার পুরোনো সমর্থকদের ফিরিয়ে আনা, যারা সম্প্রতি দল ছেড়ে আরও চরম অভিবাসনবিরোধী নীতিতে বিশ্বাসী রিস্টোর ব্রিটেনের দিকে ঝুঁকছেন।

রুপার্ট লো-র রিস্টোর ব্রিটেন ইতিমধ্যে ৯৬ হাজারেরও বেশি সদস্য সংগ্রহ করেছে এবং রিফর্ম ইউকে থেকে বহু স্থানীয় কাউন্সিলর তাদের দলে যোগ দিয়েছেন। দলটির ইশতেহারে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে তারা ব্রিটেনে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় গণ-ডিপোর্টেশন বা অভিবাসী বিতাড়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। এই কট্টর অবস্থানের কারণেই মেকারফিল্ড উপ-নির্বাচনের ঠিক আগে ফারাজের ভোটাররা দল পরিবর্তন করছেন। এই উপ-নির্বাচনটি মূলত লেবার পার্টির বর্তমান এমপি জশ সায়মন্সের পদত্যাগের পর তৈরি হয়েছে, যিনি ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামকে ওয়েস্টমিনস্টারে ফেরার সুযোগ করে দিতে আসনটি ছেড়ে দেন। লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ নিয়ম অনুযায়ী, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হলে অবশ্যই কমন্সসভার সদস্য হতে হয়, আর বার্নহাম মূলত প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ জানাতেই এই আসন থেকে নির্বাচন করছেন।

মেকারফিল্ডে ১৯৮৩ সাল থেকে লেবার পার্টি জয়ী হয়ে আসলেও এবারের লড়াই সহজ হবে না বলে সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে। সার্ভেশন-এর এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, লেবার পার্টির অ্যান্ডি বার্নহাম ৪৩ শতাংশ ভোট নিয়ে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন, যেখানে রিফর্ম ইউকে-র প্রার্থী রবার্ট কেনিয়ন ৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে তার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন। তবে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে নতুন দল রিস্টোর ব্রিটেন, যার প্রার্থী রেবেকা শেপার্ড প্রথম সংসদীয় লড়াইয়ে নেমেই ৭ শতাংশ ভোট নিজের পকেটে পুরেছেন। এই ৭ শতাংশ ভোট মূলত রিফর্ম ইউকে-র নিশ্চিত ভোটব্যাংক থেকে আসায় নাইজেল ফারাজের জয়ের সম্ভাবনা বড় ধাক্কা খেয়েছেন। ডানপন্থীদের এই অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত লেবার পার্টিকে সুবিধা দেবে নাকি ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন কোনো উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান ঘটাবে, তা আগামী ১৮ জুনের ভোটের পরেই স্পষ্ট হবে।

banner
Link copied!