আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের সমীকরণটি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। সম্প্রতি চীন সফরকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং যুক্তরাষ্ট্রকে এক প্রকার ক্ষয়িষ্ণু শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথা উল্লেখ করে দাবি করেছেন যে, অচিরেই বিভিন্ন সূচকে ওয়াশিংটনকে পেছনে ফেলে শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসবে চীন। বেইজিংয়ের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে।
একটি দেশের বৈশ্বিক অবস্থান মূলত তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সামরিক শক্তির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। বিভিন্ন থিঙ্ক ট্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, এই দুটি ক্ষেত্রেই চীন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডারের পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মার্কিন অর্থনীতির আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩২.৩৮ লাখ কোটি ডলার। সেই তুলনায় চীনের অর্থনীতি ২০.৮৫ লাখ কোটি ডলারে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ, বিনিময় হারের বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চীনের তুলনায় প্রায় ১.৫৪ গুণ বড়।
চীনের অর্থনীতির কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। সস্তা শ্রমিকের ওপর নির্ভর করে এতদিন দেশটি বৈশ্বিক বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু এখন ভূ-রাজনৈতিক কারণে অনেক বহুজাতিক সংস্থা ভারতসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের দিকে সরে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল তাদের আইফোন উৎপাদনের একটি বড় অংশ চীন থেকে ভারতে সরিয়ে এনেছে। এটি চীনের উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।
চীনের জনতাত্ত্বিক সংকটও দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টানা চার বছর ধরে দেশটির জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে এবং জন্মহার ১৯৪৯ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাশাপাশি মৃত্যুহার বেড়েছে ১৯৬৮ সালের পর সর্বোচ্চ। জাতিসংঘের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০০০ সালের পরবর্তী শতাব্দী নাগাদ চীনের লোকসংখ্যা বর্তমানের অর্ধেক হয়ে যেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ধনী হওয়ার আগেই চীন বুড়িয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের কর্মশক্তি এবং উৎপাদনশীলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা অভিবাসন নীতির কারণে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মেধাবী ও শিল্পপতিদের জন্য দেশটি ঐতিহাসিকভাবেই একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। যদিও ২০২১ সালে ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সিইবিআর ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে ২০৩০ সালের মধ্যে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে লন্ডনের ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সসহ অনেক প্রতিষ্ঠান এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে। তাদের মতে, উদ্ভাবনী প্রযুক্তির অভাব এবং হ্রাসমান কর্মশক্তির কারণে চীন সহসাই যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করতে পারবে না।
সামরিক ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন তার আধিপত্য বজায় রেখেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা খাতে ৯০ হাজার কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করছে, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১.৫ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। সেখানে চীনের সামরিক বাজেট ৩০ হাজার কোটি ডলারের আশেপাশে। এছাড়া অস্ত্র তৈরির প্রযুক্তিতে বেইজিং এখনও স্বনির্ভরতা অর্জনের লড়াই করছে। সিঙ্গাপুরের সাবেক কূটনীতিক কিশোর মাহবুবানির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পতন আসন্ন বলে যারা প্রচার করছেন, তাদের ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। অর্থনীতির হিসাব এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ব্যবধান কমার বদলে বরং বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
