ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের গল্প লিখলেন গুসকরা শহরের বাসিন্দা কলিতা মাঝি। একজন গৃহকর্মী থেকে সরাসরি রাজ্যের মন্ত্রী হিসেবে তার শপথ গ্রহণ শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং গ্রামীণ ভারতের সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের এক বড় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যে সংগ্রামী জীবন তিনি কাটিয়েছেন, তার পুরস্কার যেন এক নতুন দায়িত্বের রূপ নিয়ে এসেছে তার সামনে।
পূর্ব বর্ধমান জেলার সাধারণ এক পরিবারে বেড়ে ওঠা কলিতার জন্য জীবন কোনোদিনই মসৃণ ছিল না। সংসারের খরচ জোগাতে এবং একমাত্র সন্তানকে পড়াশোনা করানোর জন্য তিনি নিয়মিত অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। এমনকি নির্বাচনী মনোনয়ন জমা দেওয়ার আগের দিন পর্যন্ত তাকে এই পরিশ্রমের কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে। একজন কলের মিস্ত্রির স্ত্রী হিসেবে সংসার ও বাইরের জগত সামলানোর অভিজ্ঞতা তাকে মানুষের কাছাকাছি এনেছে। স্থানীয়দের কাছে তিনি সবসময়ই একজন পরিশ্রমী ও বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরুতে তাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আউশগ্রাম আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি পরাজিত হন। সেবার ১১,৮১৫ ভোটের ব্যবধানে হারলেও তিনি হাল ছাড়েননি। পরাজয়ের গ্লানি ভুলে তিনি তৃণমূল স্তরে জনসংযোগ বজায় রেখেছিলেন। সেই ধৈর্য ও পরিশ্রমের ফল মেলে ২০২৬ সালের নির্বাচনে। আউশগ্রাম থেকে তিনি ১২,৫০০-এর বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে রাজনীতির মাঠে নিজের শক্ত অবস্থান প্রমাণ করেন।
নির্বাচনী জয়ের পরপরই তার রাজনৈতিক পদক্ষেপে দ্রুত পরিবর্তন আসে। গত ১ জুন লোকভবনে রাজ্যপাল এবং মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তিনি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, তিনি সাধারণ মানুষের কষ্ট বোঝেন এবং সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই মানুষের সেবা করতে চান। ক্ষমতার মোহে নিজেকে বদলে ফেলার চেয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার ওপরই বেশি জোর দিচ্ছেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, কলিতা মাঝির মন্ত্রিত্ব লাভ পশ্চিমবঙ্গে নতুন প্রজন্মের কর্মীদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা। কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবার বা উচ্চবিত্ত ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা যে উচ্চপদে আসীন হতে পারেন, তার প্রমাণ এই জয়। আউশগ্রামের মানুষ এখন তাকে মন্ত্রী হিসেবে দেখছেন, তবে তিনি নিজেও বলছেন, মানুষের সেবাই তার আসল লক্ষ্য। তার এই উত্থান ভারতীয় রাজনীতির প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে তৃণমূল কর্মীবাহিনীর মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
