লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি ঘোষণার চব্বিশ ঘণ্টাও পার না হতেই শনিবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়েছে বলে রয়টার্স এবং বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং কামানের গোলার আঘাতে অন্তত ১১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল নাবাতিয়াহ শহর এবং এর আশেপাশের এক ডজনেরও বেশি এলাকা, যা পুরো অঞ্চলে নতুন করে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন যে, বোমাবর্ষণের পর দক্ষিণ লেবাননের আকাশ জুড়ে বিশাল ধূসর ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা গেছে যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এই হামলার পক্ষে যুক্তি দিয়ে দাবি করেছে যে, তারা হিজবুল্লাহর সন্ত্রাসী লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হেনেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননে মোদায়েন করা ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর ৫০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট নিক্ষেপ করার পর এই পাল্টা হামলা চালানো হয়। তবে ওয়াশিংটন এই অব্যাহত সামরিক অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেছে, কারণ এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার এই চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত ছিল। মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন যে এই হামলাগুলোর কারণে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ভেস্তে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আলোচনার মাধ্যমে শান্তি চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে সুইজারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন বলে জানা গেছে। তেহরান অবশ্য শুরু থেকেই জোর দিয়ে আসছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো বৃহত্তর শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। হিজবুল্লাহর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হাসান ফাদলুল্লাহ লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন যে, ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জবাব দেওয়ার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে তাদের মূল লক্ষ্য হলো শত্রু যেন যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পূর্ণভাবে মেনে চলে এবং লেবাননের কোনো গ্রাম বা নতুন কোনো অবস্থান দখল করার চেষ্টা না করে। হিজবুল্লাহ সতর্ক করেছে যে ইসরায়েলি আক্রমণ অব্যাহত থাকলে তারাও প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো, এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত টিকবে কিনা, কারণ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য নিজের দেশের ভেতরেই তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনের কাছে নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমান উদ্বোধনের সময় নেতানিয়াহুর প্রশংসা করে তাকে একজন প্রকৃত যোদ্ধা বলে অভিহিত করেছেন। চলতি বছরের মার্চ মাসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করলে লেবানন এই বৃহত্তর সংঘাতের মুখোমুখি হয়। বর্তমানে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের প্রায় পাঁচ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতের কারণে লেবাননের প্রায় দশ লাখ মানুষবাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং দক্ষিণাঞ্চলের বহু এলাকা সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
