রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান চুক্তিতে ইসরায়েলে তীব্র ক্ষোভ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২০, ২০২৬, ১১:০২ পিএম

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান চুক্তিতে ইসরায়েলে তীব্র ক্ষোভ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকের তীব্র বিরোধিতা করে ইসরায়েলি রাজনীতি ও গণমাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে শনিবার আল জাজিরা এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস নিশ্চিত করেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই কূটনৈতিক সমঝোতাকে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের স্বার্থের বিরুদ্ধে একটি চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছেন দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাধারণ জনগণ। দীর্ঘ ১১০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে যা ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দিয়েছে।

ইসরায়েলের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ইসরায়েল হাইয়ম-এ প্রকাশিত একটি কলামে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করে বলা হয়েছে যে তিনি একটি খুনি ও নিষ্ঠুর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে আত্মসমর্পণের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। ওই নিবন্ধে ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে যে তিনি বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম সেরা একজন রাষ্ট্রপতি হতে পারতেন কিন্তু তিনি তার সেই সুযোগ হারিয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান দাতা মরিয়ম অ্যাডেলসনের মালিকানাধীন এই সংবাদপত্রে এমন কড়া সমালোচনা প্রকাশের ঘটনাটি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যকার গভীর ফাটলকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের মতে এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হাত আরও শক্তিশালী হবে যা ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি তৈরি করবে।

ইসরায়েলের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ১২ দ্বারা পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে যে দেশটির মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ মনে করেন ইসরায়েল এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। অন্যদিকে প্রায় ৭১ শতাংশ ইসরায়েলি নাগরিক ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর থেকে তাদের বিশ্বাস হারিয়েছেন এবং তারা মনে করেন যে ওয়াশিংটন ইরানের সাথে আলোচনায় ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তি নিয়ে এখনো সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও তার মন্ত্রিসভার উগ্র ডানপন্থী সদস্যরা ইতিমধ্যেই এই শান্তি প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে চুক্তি সত্ত্বেও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো মার্কিন প্রশাসনের এই আকস্মিক কৌশলগত পরিবর্তনের পর ইসরায়েল কীভাবে তাদের ভবিষ্যৎ সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে। চুক্তি অনুযায়ী ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং এর বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িক স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে ইরান তাদের ফ্রিজ হয়ে থাকা শত কোটি ডলারের তহবিল ফেরত পাবে যা তাদের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করবে। ইসরায়েলের বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ায়র লাপিদ এই চুক্তিকে দেশটির পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির সবচেয়ে বড় এবং মর্মাণ্তিক ব্যর্থতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বেন গুরিওন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাগাই রাম আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে এতদিন ইসরায়েলের সাধারণ মানুষের কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্প সবচেয়ে জনপ্রিয় একজন বিদেশী ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমাদৃত হলেও এই চুক্তির পর তিনি এক প্রধান খলনায়কে পরিণত হয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইসরায়েলের ১৯৪৮ সাল থেকে চলে আসা ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সামরিক জোট এখনো অটুট থাকলেও এই আকস্মিক সমঝোতা স্মারক দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও সম্পর্কে এক অভূতপূর্ব ফাটল তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ওয়াশিংটনের এই একক এবং একপাক্ষিক কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত তেল আবিবকে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর একাকীত্ব এবং চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

banner
Link copied!