যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার তীব্র political সংকটের মুখে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পদত্যাগ করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছেন বলে রবিবার জানা গেছে, দ্য গার্ডিয়ান এবং আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। মেকারফিল্ড সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে তার প্রধান অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের বিশাল বিজয়ের পর ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভেতরেই কিয়ার স্টারমার পদত্যাগ ও নেতৃত্বের পরিবর্তনের জোর দাবি উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ম্যানচেস্টারের বিদায়ী মেয়র বার্নহ্যাম বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার পর থেকে সরকারের শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা স্টারমারকে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতির কারণে কিয়ার স্টারমার পদত্যাগ করার একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করতে পারেন বলে লেবার পার্টির নীতিনির্ধারকরা আভাস দিয়েছেন।
মেকারফিল্ডের এই উপনির্বাচনে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম প্রায় ৫৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ঐতিহাসিক জয় লাভ করেন, যা ব্রিটিশ রাজনীতিতে একটি বড় মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রিফর্ম ইউকে দলের প্রার্থী রবার্ট কেনিয়নের চেয়ে ৯,২৩১ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। সোমবার বার্নহ্যাম আনুষ্ঠানিকভাবে কমন্স সভায় সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন এবং এর পরপরই তিনি স্টারমারের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেন। বার্নহ্যামের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা জানিয়েছেন যে ইতিমধ্যেই প্রায় ২০০ জন লেবার সংসদ সদস্য তাকে পরবর্তী দলীয় নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন দিয়েছেন, যার ফলে কিয়ার স্টারমার পদত্যাগ করার জন্য দলীয়ভাবে সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
এই তীব্র চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বর্তমানে তার সরকারি বাসভবন চেকার্সে পরিবারের সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের সাথে পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা করছেন। যদিও গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে স্টারমার দাবি করেছিলেন যে তিনি কোনো অবস্থাতেই পদত্যাগ করবেন না এবং যেকোনো ধরনের নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে প্রস্তুত আছেন, তবে রবিবার পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। বাণিজ্যমন্ত্রী পিটার কাইল বিবিসির একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বলেছেন যে প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর গভীর নজর রাখছেন এবং দেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে লেবার পার্টির লর্ড সভার জ্যেষ্ঠ সদস্য চার্লি ফ্যালকনার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রীর এখন আর কোনো রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অবশিষ্ট নেই।
লেবার পার্টির ভেতরে কিয়ার স্টারমারের বিরুদ্ধে এই অসন্তোষ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি, বরং গত কয়েক মাস ধরেই তার জনপ্রিয়তা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছিল। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সাধারণ নির্বাচনে বিশাল জয় নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর থেকে স্টারমার সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং জনসেবামূলক খাতগুলোর সংস্কারে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশ হওয়া গোপন নথি থেকে জানা যায় যে স্টারমার যাকে ওয়াশিংটনে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, সেই পিটার ম্যান্ডেলসন কুখ্যাত জেফরি এপস্টেইনের কেলেঙ্কারির সাথে যুক্ত ছিলেন। এই বিতর্ক এবং প্রবীণ নাগরিকদের জন্য শীতকালীন জ্বালানি সহায়তা বন্ধের মতো কিছু অজনপ্রিয় নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ মানুষের মাঝেও স্টারমারের জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
পররাষ্ট্রসচিব ইভেট কুপার এবং যোগাযোগমন্ত্রী হেইডি আলেকজান্ডার ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগের সময়সূচি নির্ধারণ করার জন্য ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছেন বলে ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বিপর্যয়ের পর থেকেই দলের একটি বড় অংশ কিয়ার স্টারমার পদত্যাগ করার দাবি তুলেছিল, যা এই উপনির্বাচনের ফলের পর চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। রিফর্ম ইউকে দলের প্রধান নাইজেল ফারাজ এই নির্বাচনী ফলকে অত্যন্ত নাটকীয় বলে বর্ণনা করেছেন এবং স্বীকার করেছেন যে লেবার পার্টির এই পরিবর্তন ব্রিটিশ রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে।
কিয়ার স্টারমার যদি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন, তবে যুক্তরাজ্য গত ১০ বছরের মধ্যে তাদের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী দেখতে পাবে, যা দেশটির আধুনিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রমাণ। দলের নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো নতুন নেতা নির্বাচিত হতে হলে অন্তত ২০ শতাংশ সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়, যা অ্যান্ডি বার্নহ্যামের ইতিমধ্যেই রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের সাবেক মন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় নামার ঘোষণা দিলেও বার্নহ্যামের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন থাকায় তার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। যা কম স্পষ্ট তা হলো আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠিতব্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে অন্য জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা স্টারমারের বিরুদ্ধে সরাসরি অনাস্থা প্রকাশ করবেন নাকি তিনি তার আগেই সোমবার বিদায়ের ঘোষণা দেবেন। লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিটের এই ক্ষমতা বদল ব্রিটেনের পুরো রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে চিরতরে বদলে দিতে পারে।
