রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩

ইউক্রেনে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট: সুযোগ নেবে রাশিয়া

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২১, ২০২৬, ১০:০৪ পিএম

ইউক্রেনে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট: সুযোগ নেবে রাশিয়া

প্যারিস ও কিয়েভ থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স রবিবার এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান সংঘাতের কারণে ইউক্রেনে মার্কিন তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেন। ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের মিত্ররা ইরানের ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ভূপাতিত করার জন্য বিপুল পরিমাণে মার্কিন তৈরি প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করায় ইউক্রেনের জন্য এই ব্যবস্থার গোলাবারুদ বা ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে কিয়েভের এই সামরিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মস্কো তাদের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ও হামলা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্প খাত একই সাথে দুটি বড় যুদ্ধক্ষেত্রে এই ব্যয়বহুল এবং উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে যা পূর্ব ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনকে চরম প্রতিরক্ষাহীন অবস্থার মধ্যে ফেলেছে।

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে অবস্থানরত আল জাজিরার বিশেষ সংবাদদাতা মানসুর মিরোভালেভ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন যে রুশ সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যেই ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এই গোলাবারুদ সংকটের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ট্রাক-মাউন্টেড প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থাগুলো অত্যন্ত দ্রুত গতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে রাশিয়ার গর্ব হিসেবে পরিচিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে ধ্বংস করতে সক্ষম ছিল যা পুতিন একসময় অভেদ্য বলে ঘোষণা করেছিলেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় অংশ ইসরায়েল এবং অন্যান্য regional

মিত্রদের সুরক্ষায় ডাইভার্ট বা স্থানান্তরিত করতে বাধ্য হয়েছে। এই কৌশলগত পরিবর্তনের ফলে ইউক্রেনীয় বাহিনী এখন রাশিয়ার নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ পাচ্ছে না যার ফলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো চরম ঝুঁких মধ্যে পড়েছে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে একটি একক প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় হয় এবং এটি তৈরি করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। ইউক্রেন গত কয়েক বছর ধরে রাশিয়ার হাইপারসনিক এবং ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা থেকে তাদের প্রধান শহরগুলোকে রক্ষা করার জন্য সম্পূর্ণভাবে এই প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল। পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্র মজুত অত্যন্ত সীমিত পর্যায়ে চলে এসেছে এবং এই সংকটের কারণে তারা ইউক্রেনকে দেওয়া আগের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছে না। কিয়েভের সামরিক কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন যে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যদি এই ক্ষেপণাস্ত্রের নতুন চালান না আসে তবে দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতি রাশিয়ার বিমান বাহিনীকে ইউক্রেনের আকাশসীমায় অবাধে বিমান হামলা চালানোর একটি সুবর্ণ সুযোগ করে দেবে যা যুদ্ধের গতিপথকে চিরতরে বদলে দিতে পারে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো মার্কিন প্রশাসন কীভাবে তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত বাধ্যবাধকতা বজায় রেখে ইউক্রেনের এই জরুরি সামরিক চাহিদা পূরণ করবে। ওয়াশিংটনের অনেক নীতিনির্ধারক মনে করেন যে এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব রুখে দেওয়া আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ইউক্রেন সংকটের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই দ্বিমুখী নীতির কারণে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি বারবার পশ্চিমা মিত্রদের কাছে অতিরিক্ত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য আকুল আবেদন জানালেও আশানুরূপ কোনো সাড়া পাচ্ছেন না। সামরিক উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ইউরোপীয় মিত্ররা চেষ্টা করলেও কাঁচামাল এবং উন্নত প্রযুক্তির ঘাটতির কারণে তা বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে যা ইউক্রেনের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য কোনো কাজে আসবে না।

রুশ সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যেই ইউক্রেনের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের পূর্ব এবং দক্ষিণাঞ্চলে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্রতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে যে মস্কো তাদের ইস্কান্দার এবং কিঞ্জাল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন করেছে এবং প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের অভাব নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথেই তারা বড় ধরনের বিমান অভিযান শুরু করার পরিকল্পনা করছে। এর আগে আন্তর্জাতিক সংঘাতের সময়েও দেখা গেছে যে গোলাবারুদের ঘাটতি কীভাবে একটি সুসংগঠিত বাহিনীকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে বাধ্য করে। ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ এখন শীতের শুরুতে রাশিয়ার সম্ভাব্য বিদ্যুৎ গ্রিড ধ্বংসের হামলার আশঙ্কায় চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন কারণ আকাশ প্রতিরক্ষা ছাড়া এই ধরনের হামলা ঠেকানো অসম্ভব।

국제

প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ন্যাটো মিত্ররা যদি অবিলম্বে ইউক্রেনকে বিকল্প আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন নাসামস বা আইরিস-টি সরবরাহ করতে না পারে তবে কিয়েভের পরাজয় ত্বরান্বিত হতে পারে। তবে এই বিকল্প ব্যবস্থাগুলো রাশিয়ার ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার ক্ষেত্রে প্যাট্রিয়টের মতো কার্যকর নয় যা ইউক্রেনীয় কমান্ডোদের কৌশলগত চিন্তাকে আরও জটিল করে তুলেছে। রাশিয়ার সামরিক নীতিনির্ধারকরা খুব ভালো করেই জানেন যে আমেরিকার প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থা একই সাথে দুটি বড় আকারের আন্তর্জাতিক সংঘাতের গোলাবারুদের চাহিদা মেটাতে সক্ষম নয়। এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে ক্রেমলিন এখন ইউক্রেনকে একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে যেখানে শেষ পর্যন্ত গোলাবারুদের অভাবই জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবে।

কিয়েভের স্থানীয় বাসিন্দারা এবং সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে এই সংকট কেবল ইউক্রেনের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং এটি পুরো ইউরোপের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে। যদি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের অভাবে ইউক্রেনের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে তবে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে সরাসরি উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পাবে যা বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ কেবল আরব অঞ্চলের ভাগ্যই নির্ধারণ করছে না বরং তা পরোক্ষভাবে পূর্ব ইউরোপের ইউক্রেন যুদ্ধের ভাগ্যও পুতিনের অনুকূলে নিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে ওয়াশিংটন এই দ্বিমুখী সামরিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আগামী দিনগুলোতে কী ধরনের কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

banner
Link copied!