সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩

ভারতে পঁয়তাল্লিশ দিনে ২৩টি ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদ করল বিজেপি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২১, ২০২৬, ১০:৪৪ পিএম

ভারতে পঁয়তাল্লিশ দিনে ২৩টি ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদ করল বিজেপি

ভারতে গত পঁয়তাল্লিশ দিনে বিজেপি সরকার ২৩টিরও বেশি ঐতিহ্যবাহী মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা এবং রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই পারমাণবিক শক্তিধর দেশে উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে এই বিতর্কিত প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গত দেড় মাসে ধারাবাহিকভাবে মসজিদ, মাদরাসা, ঈদগাহ এবং ঐতিহাসিক দরগাহ ভাঙা বা আংশিকভাবে অপসারণের ঘটনা ঘটেছে। ভারতে ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার এই আকস্মিক তীব্রতা বৃদ্ধি দেশটির বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা মহলে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় রাজ্য প্রশাসন ও পৌরসভার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে সরকারি জমি সম্পূর্ণ দখলমুক্তকরণ, অনুমোদনহীন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং আধুনিক নগর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই অভিযানগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ও আইনি বিশেষজ্ঞরা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা অভিযোগ করেছেন যে বহু বছর ধরে ব্যবহৃত এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত আইনি ধর্মীয় স্থাপনাগুলোকেও জোরপূর্বক এই ধ্বংসাত্মক অভিযানের আওতায় আনা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের মতে, ধ্বংসপ্রাপ্ত কয়েকটি ঐতিহাসিক মসজিদ ও দরগাহ বহু শতাব্দী ধরে সংশ্লিষ্ট এলাকার ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই রাতারাতি এই উচ্ছেদ অভিযান চালানোর ফলে স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত এসেছে।

এই আকস্মিক উচ্ছেদ ও ভাঙচুরের ঘটনার কারণে ভারতের বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় তীব্র সামাজিক উদ্বেগ এবং সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মুসলিম ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনাগুলোকে অত্যন্ত বৈষম্যমূলক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে উল্লেখ করে বিবৃতি দিয়েছেন। তাদের মতে, আইন প্রয়োগ ও তথাকথিত উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার সময় স্থানীয় ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনার বিষয়ে প্রশাসনের যে ধরনের সংবেদনশীলতা দেখানো উচিত ছিল, তা এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। এই ধরনের একতরফা উচ্ছেদ অভিযানের ফলে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি বিশ্বমঞ্চে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এবং ধর্মীয় ট্রাস্টগুলো এই জঘন্য ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত, প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অনতিবিলম্বে ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনাগুলোর পুনর্বাসনের জোর দাবি জানিয়েছেন।

যা কম স্পষ্ট তা হলো ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এই উচ্ছেদ অভিযানের নামে দেশের বিচার ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে বুলডোজার সংস্কৃতিকে স্থায়ী রূপ দিতে চাইছে কিনা। বিজেপি পরিচালিত রাজ্য যেমন উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ এবং হরিয়ানায় এর আগেও বিনা নোটিশে মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেওয়ার বহু নজির রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসন প্রতিনিয়ত আইন লঙ্ঘন করে ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংসের এই বিপজ্জনক খেলা অব্যাহত রেখেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে যে এই ধরনের সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলও ভারতের এই সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

অন্যদিকে প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বারবার উল্লেখ করেছেন যে এই উচ্ছেদ পদক্ষেপগুলো নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়নি এবং আইন সবার জন্য সমান। এই ঘটনাকে ঘিরে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বর্তমানে তীব্র ভিন্নমুখী সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, যেখানে কট্টরপন্থী দলগুলো প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এর বিপরীতে শান্তিকামী নাগরিক সমাজ ধর্মীয় স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার রক্ষার সপক্ষে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ভারতের এই অভ্যন্তরীণ আইনি ও ধর্মীয় সংকট আগামী দিনগুলোতে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

banner
Link copied!