যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনায় অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার এবং পাকিস্তান সোমবার নিশ্চিত করেছে, যা আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও বিবিসি নিউজ-এর প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে। উভয় দেশের প্রতিনিধি দলের এই উচ্চপর্যায়ের শীর্ষ বৈঠকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শান্তি রোডম্যাপের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কাতারি ও পাকিস্তানি প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে এই ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। উচ্চপর্যায়ের এই নবগঠিত বিশেষ কমিটি দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংকট সমাধানের দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তি স্থাপন করে অবিলম্বে পরবর্তী কারিগরি ও প্রশাসনিক আলোচনা শুরু করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। এই চলমান আলোচনা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, যা একটি ভঙ্গুর ও বারবার লঙ্ঘিত আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির পর অনুষ্ঠিত হলো।
উভয় দেশের শীর্ষ কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী লেবাননের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের স্থায়ী অবসানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ডি-কনফ্লিকশন সেল বা সংঘাত নিরসন কেন্দ্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই বিশেষ কাঠামোর অধীনে লেবাননে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ এবং সেখানে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে যৌথ বিবৃতিতে বিশদভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি তার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই সফল মধ্যস্থতাকে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন যে এর মাধ্যমে ইরানি তেল ও পেট্রোরাসায়নিক রপ্তানির ওপর থেকে পূর্ববর্তী অবরোধের অবসান ঘটবে। একই সাথে ইরানের অবরুদ্ধ আন্তর্জাতিক বৈদেশিক সম্পদ মুক্তি এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের জন্য বৃহৎ পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সুইজারল্যান্ডের লুসার্ন লেকের পাশে অনুষ্ঠিত এই ম্যারাথন বৈঠক শেষে ইরানি প্রধান প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যে জেনেভা হয়ে তেহরানের উদ্দেশ্যে সুইজারল্যান্ড ত্যাগ করেছে।
সামুদ্রিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি সরাসরি জরুরি সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে মধ্যস্থতাকারীরা মনে করেন। গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত এই মূল সমঝোতার পর লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে চলমান স্থল ও আকাশ যুদ্ধের তীব্রতা সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পেলেও গত শুক্রবার একটি নতুন যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়। ইরানের পক্ষ থেকে সুরক্ষার স্বার্থে সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক নৌ ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিবাহী জাহাজগুলোর চলাচল ওই অঞ্চলে স্বাভাবিক রয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে এই অত্যন্ত সংবেদনশীল আলোচনা শুরুর ঠিক প্রাক্কালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি কড়া হুঁশিয়ারি বার্তা প্রকাশ করে বলেন যে ইরানকে অবিলম্বে লেবাননে তার বিপুল অর্থপুষ্ট প্রক্সিগুলোর উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে, অন্যথায় তেহরানের ওপর পুনরায় কঠোর সামরিক আঘাত হানা হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই প্রকাশ্য ও সরাসরি হুমকির জবাবে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ওয়াশিংটনের সমস্ত নীতিকে অকার্যকর আখ্যা দিয়ে বলেন যে কোনো হুমকিতে ইরান তার কৌশলগত অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসবে না। যা কম স্পষ্ট তা হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লেবানন সীমান্তে দীর্ঘকাল সেনা মোতায়েন রাখার জেদ আগামী দিনগুলোতে এই ৬০ দিনের রোডম্যাপকে কতটা সংকটের মুখে ফেলবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অবশ্য জানিয়েছেন যে ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্য নীতির ক্ষেত্রে অতীতের ভুলত্রুটি ভুলে সম্পূর্ণ নতুন একটি অধ্যায় শুরু করতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী। দীর্ঘ চার দশকের বৈরিতার অবসান ঘটাতে ইরান যদি তার পরমাণু কর্মসূচির peaceful বা শান্তিপূর্ণ রূপ বজায় রাখে তবে ওয়াশিংটন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মৌলিক রূপান্তর ঘটাতে প্রস্তুত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
